শিক্ষা ক্ষেত্রের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের ম্যানিফেস্টোতে শিক্ষা বিষয়কে কেন্দ্রীয় স্থান দিতে হবে, বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন। শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি, শিক্ষার্থীর ফলাফলের নিম্নতা এবং সেক্টরের বৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, এটাই মূল দাবি।
শিক্ষা নীতিতে গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতি ও শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বিশেষজ্ঞদের একত্রে জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে জনগণের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এমেরিটাস মানজুর আহমেদ বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক গুরুতর ব্যর্থতার উদাহরণ। তিনি উল্লেখ করেন, বহু দশকের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এখনো কোনো সমন্বিত শিক্ষা সেক্টর পরিকল্পনা গৃহীত হয়নি।
প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুই শিক্ষা শেষ করে, তবু অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী মৌলিক সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ। এই পরিসংখ্যান শিক্ষার গুণগত মানের গভীর সমস্যাকে প্রকাশ করে।
পরবর্তী সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে বিচ্ছিন্ন উপ-সেক্টর প্রকল্পে নির্ভর করেছে, ফলে শিক্ষার বিভিন্ন শাখার মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে এবং শিক্ষার ফলাফল দুর্বল হচ্ছে, মানজুরের মতে। তিনি উল্লেখ করেন, একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
প্রাথমিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য সরকার গঠন করা একটি পরামর্শক কমিটির প্রধান হিসেবে মানজুর কাজ করেছেন। এই কমিটি শিক্ষার কাঠামোকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত নীতি প্রণয়নের চেষ্টা করেছে, তবে এখনো তা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
দ্বিতীয় স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে তিনি ‘মেকানিক্যাল ফ্যাক্টরি মডেল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ছোট ক্লাস সময়, কঠোর রুটিন এবং শিক্ষার বিষয়বস্তুর সঙ্গে বাস্তব সংযোগের অভাব শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে শিখন ও গাইডবুকের উপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ধরনের পরিবেশে শিক্ষার্থীরা বিষয়বস্তু বুঝতে পারে না, বরং মুখস্থ করার দিকে ঝুঁকছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানীয় বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। মানজুর একই সঙ্গে দ্বিতীয় স্তরের গুণগত মান উন্নয়নের জন্য গঠিত একটি সরকারী কমিটির সদস্যও ছিলেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের ওপর হয়রানির ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও কর্তৃপক্ষের অকার্যকর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, এই ধরনের সমস্যার সমাধানে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ব্যক্তিরা রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে সমস্যার প্রতি উদাসীন থাকে অথবা একই মতাদর্শ শেয়ার করে, ফলে সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হয়। শিক্ষার ক্ষেত্রটি এখন গভীরভাবে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, এবং শিক্ষকরা প্রায়শই তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পেশায় নিয়ে আসেন।
এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী সরকার যদি শিক্ষার ক্ষেত্রে বাস্তবিক পরিবর্তন আনতে চায়, তবে তা একতাবদ্ধ নীতি, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভব, মানজুরের বিশ্লেষণ।
শিক্ষা সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবায়ন করতে হলে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ উভয়ই অপরিহার্য।
পাঠকদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ: স্থানীয় স্কুলের কার্যক্রমে নিয়মিত অংশগ্রহণ করুন, শিক্ষার গুণগত মান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করুন এবং নীতি নির্ধারকদের কাছে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার দাবি করুন। আপনার মতামত ও প্রশ্ন শেয়ার করে এই আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করুন।



