রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার রঘুরামপুর গ্রামে ৪৭ বছর বয়সী রওশন আরা, যিনি কমিউনিটি হেলথ প্রোভাইডার হিসেবে কাজ করেন, তার বাড়িতে গৃহপালিত কুকুর ও বিড়ালের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সম্প্রতি তার কুকুর বল্টু হঠাৎ গর্জন করলে রিকশা চালক গর্তে পড়ে গায়ে আঘাত পায়, ফলে গ্রামবাসীর মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর থেকে রওশন আরা একদমই দিনের বেলায় পথের কুকুরদের খাবার দিতে পারেননি, যা তার জন্য প্রায় দেড় মাসের কঠিন সময়ের সূচনা করে।
অবস্থার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে সাহায্য চেয়ে যান। রওশন আরা জানান, এই সময়ে তিনি রাতের একবারই গোপনে কুকুরদের খাবার দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, আর বাকি দিনগুলোতে খাবার সরবরাহের কোনো উপায় ছিল না। ইউএনওকে আবেদন করার সময় তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, তার কুকুর যদি গ্রামবাসীর কোনো সদস্যকে কামড়ায়, তবুও তিনি ও কুকুরকে খাবার দিতে বাধ্য হবেন না, তবে এ পর্যন্ত কেউ তার কথার সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি।
ইউএনওর সহায়তা পাওয়ার পর রওশন আরা আবার নিয়মিতভাবে পথের কুকুরদের খাবার সরবরাহ শুরু করেন। বর্তমানে তার বাড়িতে মোট ৯টি বিড়াল ও ৭টি কুকুর রয়েছে, যেগুলো সবই রাস্তা থেকে তুলে এনে নিজের বাড়িতে রাখেন। এছাড়া তিনি গ্রামাঞ্চলের পাঁচটি ভিন্ন স্থানে নিয়মিত খাবার বিতরণ করেন, যাতে গৃহহীন প্রাণীরা ক্ষুধার্ত না থাকে।
রওশন আরার পরিবার তার প্রাণী সেবায় বড় ভূমিকা রাখে। তার স্বামী আজিজুল ইসলাম একজন কৃষক, আর বড় ছেলে রিয়াজুল ইসলাম পুলিশ কর্মী, ছোট ছেলে রাফিউল এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রিয়াজুলের রেশনের চাল-আটা প্রায়ই বিড়াল ও কুকুরের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, ফলে আর্থিক চাপ কমে যায়। রওশন আরা নিজে টিকাদান ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা করেন, বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে কুকুর ও বিড়ালের টিকা নিজ খরচে দেন, যাতে বাচ্চা হলে সেগুলোকে মেরে ফেলা না হয়।
প্রাণীকে মর্যাদা দেওয়ার তার নীতি স্পষ্ট: রাস্তায় কোনো কুকুর, বিড়াল, কাঠবিড়ালি বা পাখির বাচ্চা মৃত অবস্থায় দেখতে পেলে তিনি তা দাফন না করে বাড়ি ফেরেন না। পাঁচ বছর আগে একটি গর্ভবতী ও দুর্বল কুকুর তার বাড়িতে ঢুকে পড়ে, রওশন আরা তা খাবার ও যত্ন দিয়ে সেরে তোলেন এবং নাম দেন ‘দুলি’। দুলির নাম ডেকেই প্রাণীটি তার প্রতি সাড়া দিত। একইভাবে আরেকটি দুর্বল কুকুরও তার বাড়িতে ঢুকে পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পায়, এবং রওশন আরা তার যত্ন নেন।
রওশন আরার কাজের ফলে গ্রামজুড়ে কুকুর ও বিড়ালের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং প্রাণী হিংসা কমে। তার উদ্যোগের ফলে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে প্রাণী সুরক্ষার প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও তিনি কখনোই সরকারি সহায়তা ছাড়া এই কাজ চালিয়ে গেছেন, তবু তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা তার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।
স্থানীয় পর্যায়ে রওশন আরার গল্পটি একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে, যেখানে একক ব্যক্তি সমাজের অপ্রয়োজনীয় প্রাণীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও খাবার নিশ্চিত করতে পারে। তার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ছোটখাটো ঘটনার পরেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
পাঠকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল, যদি কোনো গ্রামে অনাথ প্রাণী দেখা যায়, তবে তাদের খাবার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী বা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। ছোটখাটো দান, খাবার বা সময়ের অংশগ্রহণও প্রাণী কল্যাণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। রওশন আরার মতোই, প্রত্যেকের সামান্য অবদানই প্রাণীর জীবনকে রক্ষা করতে পারে।



