মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচার সন্দেহে একটি ট্রলারে পুনরায় প্রাণঘাতী আক্রমণ চালায়। এই অভিযান শুক্রবার ঘটেছে এবং দুইজন কর্মী নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরেকজনকে বেঁচে থাকা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ডের প্রকাশ্য বিবরণে জানানো হয়েছে।
সাউদার্ন কমান্ডের টুইটার (X) পৃষ্ঠায় প্রকাশিত পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে গঠিত “জয়েন্ট টাস্কফোর্স সাউদার্ন স্পিয়ার” দলটি এই অপারেশনটি সম্পন্ন করেছে। পোস্টে বলা হয়েছে, লক্ষ্যবস্তু একটি নৌযান যা “চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংগঠন” দ্বারা পরিচালিত বলে সন্দেহ করা হয়, এবং এতে লিথাল কাইনেটিক স্ট্রাইক নামে পরিচিত উচ্চগতির গুলি ব্যবহার করা হয়েছে।
লিথাল কাইনেটিক স্ট্রাইক হল এমন একটি অস্ত্র ব্যবস্থা যা লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি উচ্চগতির গুলি চালিয়ে তা ধ্বংস করে, ফলে প্রচলিত বোমা বা মিসাইলের তুলনায় কম ধ্বংসাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। সাউদার্ন কমান্ডের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ধরনের আক্রমণ বিশেষভাবে মাদক পাচার নৌযানকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য পরিকল্পিত, এবং লক্ষ্যবস্তু নৌযানটি সনাক্ত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে আঘাত করা হয়েছে।
আক্রমণের পরপরই মার্কিন কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং বেঁচে থাকা এক কর্মীর উদ্ধার কাজ শুরু করে। কোস্টগার্ডের বিবৃতি অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত ব্যক্তি তীব্র আঘাতের শিকার হলেও জীবিত অবস্থায় হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়েছে। বাকি দুই কর্মীর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে, এবং তাদের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে এখনো কোনো অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই হামলা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে। মাদুরোকে কারাকাসে গ্রেফতার করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার পর এই আক্রমণটি প্রথম বড় মাত্রার সামরিক হস্তক্ষেপ। একই মাসের শুরুর দিকে মাদুরো আদালতে নিজের নির্দোষতা দাবি করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ তার সরকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্য বহন করে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এই অভিযানের লক্ষ্যকে মাদকবিরোধী লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন যে, মূল উদ্দেশ্য মাদুরো শাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করা। এই দ্বৈত বার্তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে, বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি সংবেদনশীলতা বিবেচনা করলে।
অঞ্চলীয় দেশগুলো থেকে এই ঘটনার প্রতি বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, তবে একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক আইনের সীমা অতিক্রম না করার আহ্বান জানিয়েছে। ভেনেজুয়েলার সরকারও এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপর কঠোর নীতি গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে।
ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা এখনও অনিশ্চিত, তবে সাউদার্ন কমান্ডের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ধরনের অপারেশন পরবর্তী পর্যায়ে আরও নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে মাদক পাচার নেটওয়ার্ককে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারির মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপের পরিণতি এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এই ঘটনার পর, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোতে মাদকবিরোধী সহযোগিতা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনার নতুন রূপ দেখা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, মাদুরোর সরকার ও তার সমর্থকরা আন্তর্জাতিক ফোরামে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করবে, যা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে এই সামরিক আক্রমণ মাদক পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তবে একই সঙ্গে এটি ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন মোড়ের সূচনা করতে পারে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতা বা সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে থাকবে।



