তেহরান ও জেরুজালেমের মধ্যে উত্তেজনা নতুন পর্যায়ে পৌঁছে, যেখানে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ইসরাইলের ড্রোন আক্রমণ থামাতে পারবে কিনা তা প্রধান প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়েছে। এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হল, ইরানের বর্তমান সিস্টেমগুলো স্টিলথ ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংসে কতটা কার্যকর।
ইরানের প্রধান আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক রাশিয়ার এস‑৩০০ পিএমইউ‑২ সিস্টেম এবং দেশীয় বাভার‑৩৭৩ মিসাইল কমপ্লেক্সের সমন্বয়ে গঠিত। এস‑৩০০ মূলত উচ্চ উচ্চতার যুদ্ধবিমান ও দ্রুতগামী মিসাইলের জন্য নকশা করা, যার সর্বোচ্চ রেঞ্জ প্রায় ২০০ কিলোমিটার। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই রাডার বড় লক্ষ্যবস্তুর জন্য অপ্টিমাইজড, ফলে ভূমি সমীপে উড়ে আসা ছোট ড্রোনগুলো প্রায়শই শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।
বাভার‑৩৭৩, যা ইরান নিজস্বভাবে উন্নয়ন করেছে, ৪৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত হুমকি শনাক্ত করতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়। এই সিস্টেমের মধ্যে খোরদাদ‑১৫ মডিউল বিশেষভাবে স্টিলথ ড্রোন সনাক্ত করার জন্য তৈরি। ইরানি কর্মকর্তারা বলেন, এই স্তরভিত্তিক পদ্ধতি আকাশীয় অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে।
অতি সংবেদনশীল স্থাপনাগুলো, যেমন নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র, রাশিয়ার টর‑এম১ সিস্টেম দিয়ে সুরক্ষিত। টর‑এম১ নিম্ন উচ্চতার লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে কার্যকর, তবে এর কভারেজ কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, ফলে এটি সম্পূর্ণ রক্ষা নয়, বরং অতিরিক্ত সুরক্ষার ভূমিকা পালন করে।
ইসরাইলের ফ্লিটে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী হেরন‑টিপি এবং হার্মিস ৯০০ ড্রোন, যেগুলো ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় আকাশে থাকতে পারে এবং উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার স্যুটে সজ্জিত। এই ড্রোনগুলো রাডারকে জ্যাম বা বিভ্রান্ত করতে পারে, ফলে প্রচলিত রাডার সিস্টেমের জন্য লক অর্জন কঠিন হয়ে যায়।
ইসরাইলের সবচেয়ে হুমকিপূর্ণ সম্পদ হল ‘হারপি’ আত্মঘাতী ড্রোন, যা শত্রু রাডার সিগন্যাল অনুসরণ করে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। ইরানের পাহাড়ি ভূখণ্ডে গঠিত স্বাভাবিক ব্লাইন্ড স্পটগুলো এই ড্রোনগুলোকে উপত্যকা থেকে নিচে উড়ে আসা থেকে রাডার শনাক্তকরণকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের বেসামরিক যুদ্ধের নতুন ধাপ হিসেবে দেখছেন। জাতিসংঘের একজন সিনিয়র কূটনীতিক মন্তব্য করেন, “স্টিলথ ড্রোনের বিস্তার আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে দিচ্ছে, এবং প্রচলিত মিসাইল‑ভিত্তিক প্রতিরক্ষা দ্রুত আপডেট প্রয়োজন।” এই বক্তব্য ইরানের রাডার আধুনিকীকরণের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
ওয়াশিংটন ইসরাইলকে ইরানি আকাশে আক্রমণাত্মক ড্রোন চালু করা থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করেছে। সাম্প্রতিক ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, “অনড্রোন সিস্টেমের মাধ্যমে কোনো উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে ন্যাটো অংশীদারদেরও জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে রাশিয়ান সরবরাহিত সরঞ্জাম ইরানের প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হওয়ায়।”
ইরানের প্রতিক্রিয়া স্বনির্ভরতা জোর দিয়ে এসেছে। ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর একজন মুখপাত্র ঘোষণা করেন, “আমরা স্বদেশীয় রাডার ও মিসাইল প্রযুক্তি বিকাশ চালিয়ে যাব, যাতে কোনো শত্রু আকাশীয় হুমকি মোকাবেলা করা যায়।” এই দাবি দেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলকে প্রতিফলিত করে, যা বিদেশি সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়।
আসন্ন জেনেভা নিরাপত্তা ফোরামে ইরান, ইসরাইল এবং প্রধান শক্তিগুলো আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা আশা করেন, আকাশ প্রতিরক্ষা আন্তঃক্রিয়ার প্রযুক্তিগত বিনিময় দুর্ঘটনাজনিত সংঘর্ষের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে।
এইসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, ইরানের এস‑৩০০ ও বাভার‑৩৭৩ ড্রোনের বিরুদ্ধে বাস্তব কার্যকারিতা এখনও অনিশ্চিত। প্রচলিত বিমান ও মিসাইলের বিরুদ্ধে তাদের কভারেজ যথেষ্ট হলেও, কম দৃশ্যমান, উচ্চ স্থায়িত্বের UAV গুলোকে নির্ভরযোগ্যভাবে ধ্বংস করা এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৫ সালের শেষের দিকে ইরান একটি লাইভ‑ফায়ার অনুশীলন পরিচালনা করে, যেখানে বাভার‑৩৭৩ ব্যাটারি একটি সিমুলেটেড স্টিলথ ড্রোনকে ৪০০ কিলোমিটার দূর থেকে ট্র্যাক করে এবং মিসাইল দিয়ে ধ্বংস করে। অফিসিয়াল ভিডিওতে রাডার লক এবং সফল ধ্বংসের দৃশ্য দেখা যায়, তবে দ্রুত প্রতিক্রিয়া সময়ের প্রয়োজনীয়তা এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, তাদের ড্রোন অপারেশন কেবল গোয়েন্দা সংগ্রহ এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য, এবং “প্রয়োজনীয় হলে রাডার এড়িয়ে চলা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।” এই মন্তব্য ইসরাইলের প্রযুক্তিগত আধিপত্য বজায় রাখার নীতি প্রকাশ করে, পাশাপাশি আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য অস্বীকার করে।
উচ্চ উচ্চতা ও দীর্ঘস্থায়ী ড্রোনের উপস্থিতি বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অথরিটিজ এয়ারলাইনগুলোকে অঞ্চলটি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে এবং সাময়িক ফ্লাইট লেভেল সমন্বয় করতে আহ্বান জানিয়েছে। তেহরান ও জেরুজালেম উভয়কেই আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে বাণিজ্যিক বিমান দুর্ঘটনা রোধের নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে।



