ইউএস পেন্টাগনের ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত বার্ষিক বিশ্লেষণে চীনকে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সর্ববৃহৎ মজুদধারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের সামরিক প্রযুক্তি গত দুই দশকে দ্রুত অগ্রগতি করেছে এবং বর্তমানে তার কাছে প্রচলিত ও পারমাণবিক উভয় ধরণের হাইপারসনিক মিসাইলের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। পূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে এই ক্ষেত্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরা হতো, তবে নতুন তথ্য অনুযায়ী চীন এখন শীর্ষে অবস্থান করছে।
হাইপারসনিক মিসাইলের মূল বৈশিষ্ট্য হল শব্দের গতি থেকে কমপক্ষে পাঁচ গুণ দ্রুত বায়ুমণ্ডলে দীর্ঘ সময় ধরে চলা। এই উচ্চ গতি এবং মাঝপথে দিক পরিবর্তনের ক্ষমতা রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে এগুলোকে অদৃশ্য করে তুলতে সহায়তা করে। ফলে শত্রু দেশগুলোর জন্য এই অস্ত্রের গন্তব্য নির্ধারণ বা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
চীনের প্রতিরক্ষা বাজেটের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পেছনের প্রধান কারণ। শি জিনপিং শাসনকালে সামরিক ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যার একটি বড় অংশ হাইপারসনিক মিসাইলের গবেষণা ও উৎপাদনে ব্যয় করা হয়েছে। ইউএস পেন্টাগন উল্লেখ করেছে, এই আর্থিক সমর্থন চীনের গবেষণা সংস্থা ও রকেট ফোর্সকে আধুনিক উপাদান ও পরীক্ষামূলক সুবিধা প্রদান করেছে।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি রকেট ফোর্স বর্তমানে WJ-21 নামের অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইল পরিচালনা করে। এই মিসাইলটি কেবল জাহাজের বিরুদ্ধে নয়, বিমান থেকে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব, যা তার ব্যবহারিক পরিসরকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়। সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের সামরিক প্রদর্শনীতে CJ-1000 এবং WJ-20 সহ নতুন প্রজন্মের হাইপারসনিক সিস্টেমের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যা চীনের কৌশলগত ক্ষমতাকে বহু গুণ বৃদ্ধি করেছে।
এই নতুন সিস্টেমগুলো উচ্চতর গতি, উন্নত গাইডেন্স এবং দীর্ঘ পরিসরের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। বিশেষ করে CJ-1000 একটি ক্রুজ মিসাইলের রূপান্তর, যা হাইপারসনিক গতি অর্জন করে এবং বিভিন্ন উচ্চতা ও ভৌগোলিক অবস্থানে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম। WJ-20 মিসাইলের ক্ষেত্রে, এর গতি ও চপলতা রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ব্যালিস্টিক মিসাইলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে।
ইউএস পেন্টাগনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনের হাইপারসনিক মিসাইলের সংখ্যা এবং বৈচিত্র্য রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট মজুদের চেয়ে বেশি। যদিও রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উন্নত হাইপারসনিক প্রকল্প রয়েছে, তবু চীনের সামগ্রিক স্টকপাইল ও উৎপাদন ক্ষমতা তাদের তুলনায় অগ্রগামী। এই তথ্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও হাইপারসনিক প্রযুক্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তবে চীনের দ্রুত অগ্রগতি তাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দেন, চীনের এই আধিপত্য সামরিক ভারসাম্যকে পরিবর্তন করতে পারে এবং ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে পারে। তবে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতামত এখনও বিভক্ত।
চীনের হাইপারসনিক মিসাইলের উন্নয়নে অংশগ্রহণকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোর মধ্যে চীনা একাডেমি অফ সায়েন্সেস, চায়না সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় রক্ষা সংস্থা উল্লেখযোগ্য। এই সংস্থাগুলো যৌথভাবে উপাদান বিজ্ঞান, এয়ারোডাইনামিক্স এবং গাইডেন্স সিস্টেমে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাজের ফলস্বরূপ মিসাইলের রেঞ্জ, নির্ভুলতা এবং প্রতিক্রিয়া সময়ে ধারাবাহিক উন্নতি দেখা যাচ্ছে।
হাইপারসনিক প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহারও ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। উচ্চ গতির পরিবহন, মহাকাশ গবেষণা এবং সিভিল এয়ারোস্পেসে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও বর্তমানে এই ক্ষেত্রগুলোতে সামরিক প্রয়োগই প্রধান, তবে ভবিষ্যতে বেসামরিক শিল্পে রূপান্তর সম্ভব হতে পারে।
চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন নিয়ম ও চুক্তির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। হাইপারসনিক মিসাইলের নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি সীমাবদ্ধতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য বহু দেশ একত্রিত হয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউএস পেন্টাগন এই প্রতিবেদনকে একটি সতর্কতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যাতে অন্যান্য দেশগুলোও এই প্রযুক্তির বিকাশে সমানভাবে মনোযোগ দেয়।
সারসংক্ষেপে, ইউএস পেন্টাগনের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ চীনের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারকে বিশ্বে সর্বোচ্চ হিসেবে তুলে ধরেছে, যা সামরিক কৌশল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে হাইপারসনিক প্রযুক্তি বিশ্ব নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি নীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।



