ইরান সরকার বর্তমানে অর্থনৈতিক মন্দা ও ব্যাপক প্রতিবাদে চাপের মুখে, যেখানে গত ডিসেম্বর থেকে মুদ্রা হ্রাসের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তেহরান শহরে সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন সাময়িক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে, তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে এই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী নয়।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশের শাসনব্যবস্থা বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতি সম্ভবত সর্বোচ্চ চ্যালেঞ্জের মুখে। মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের হার অব্যাহতভাবে বাড়ছে, ফলে জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষের স্রোত তীব্রতর হচ্ছে।
মুদ্রার মান দ্রুত হ্রাসের ফলে মূল পণ্য ও জ্বালানির দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা গৃহস্থালীর ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করেছে। এই আর্থিক অস্থিরতা সরাসরি প্রতিবাদে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে শ্রমিক, ছাত্র ও মধ্যবিত্তের সমাবেশ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিবাদ প্রথমে তেহরানের কেন্দ্রীয় বাজারে শুরু হয়, তবে দ্রুতই অন্যান্য প্রদেশে বিস্তৃত হয়ে সরকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের সামনে ভিড় জমায়। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন সত্ত্বেও, প্রতিবাদকারীরা সড়ক বন্ধ করে, সরকারি ভবন দখল করে এবং অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তনের দাবি জানায়।
ইরান সরকার সশস্ত্র দমন ও ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে অস্থায়ী শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে, তবে এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে জনমতকে আরও উত্তেজিত করতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা শাসনের বৈধতা ক্ষয় করতে পারে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যা দেশের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যে গণ্য। আহত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় মানবিক সংকটও তীব্রতর হচ্ছে।
এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং দুর্নীতির বিস্তৃতি উল্লেখ করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা দেশীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরানের কূটনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত, হিজবুল্লাহর প্রভাব হ্রাস এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন ইরানের কৌশলগত গভীরতাকে কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনও তেহরানের প্রভাবকে সীমিত করেছে।
দেশীয় পর্যায়ে শাসনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তীব্রতর হয়েছে। নাগরিকরা সরকারী নীতি ও ধর্মীয় নেতৃত্বের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সুরক্ষা বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, ইরান সরকার ধীরে ধীরে ধর্মীয় নেতৃত্ব থেকে সামরিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারে, যেখানে রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাব সর্বোচ্চ হতে পারে। এই পরিবর্তন শাসন কাঠামোর স্বাভাবিকতা ও জনসাধারণের আস্থা উভয়কেই প্রভাবিত করবে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত তেহরানের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়িয়েছে। পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ইরানের কূটনৈতিক বিকল্পকে সীমিত করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিচ্ছেন যে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচন প্রক্রিয়া যদি অনিশ্চিত থাকে, তবে বর্তমান সংকট আরও তীব্র হবে। অর্থনৈতিক সংস্কার বা শাসন কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন না হলে অস্থিরতা রাষ্ট্রের ভিত্তি নষ্ট করতে পারে, যা দেশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলবে।



