প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, শনিবার সিলেটের বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে সংবিধান সংস্কারের জন্য জুলাই সনদ এবং গণভোটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সংবিধানের দুর্বলতা দূর না করা পর্যন্ত দেশের শাসনব্যবস্থা একক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে।
স্মরণ করিয়ে দিলেন, স্বাধীনতার পর থেকে একাধিকবার সংবিধান এক ব্যক্তির ইচ্ছায় পরিবর্তিত হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করেছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন সংবিধানের মৌলিক ত্রুটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জুলাই সনদ প্রস্তুতিতে অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনায় অংশ নিয়েছে। প্রায় নয় মাসের সমন্বিত আলোচনা শেষে একটি খসড়া তৈরি করা হয়, যেখানে সংবিধানের স্পষ্ট পরিবর্তনের ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রধান লক্ষ্য হল একক ব্যক্তির ক্ষমতার আধিপত্য থেকে বেরিয়ে এসে শাসনব্যবস্থাকে বহুমুখী ও গণতান্ত্রিক কাঠামোতে রূপান্তরিত করা। রীয়াজ বলেন, এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ স্বভাবতই হ্রাস পাবে।
তিনি জোর দিয়ে বললেন, জুলাই সনদ কার্যকর হলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জিত হবে না। নতুন সরকারই এই সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তাই সনদে কোনো স্বার্থপর ধারা নেই।
দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার ফলস্বরূপ, সব প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সনদের মূল বিষয়গুলোতে একমত হয়েছেন। রীয়াজ উল্লেখ করেন, এই ঐক্যমত্যই সনদকে জনগণের সামাজিক চুক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে।
গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যদি হ্যাঁ ভোট দেয়, তবে রাজনৈতিক দলগুলো এই নৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাবে না, এটাই তার প্রত্যাশা। তিনি বিশ্বাস প্রকাশ করেন, ভোটের ফলাফল সংবিধান সংস্কারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম সংক্রান্ত গুজবের প্রতিক্রিয়ায় রীয়াজ স্পষ্ট করে বলেন, গণভোটে জনগণ যদি সম্মতি দেয়, তবে সংবিধানে বিসমিল্লাহ, মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংযোজন হবে না। এই বিষয়ে কোনো ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জুলাই সনদে মোট ৮৪টি বিষয়ের পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে সেসব ধারায় বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্মের উল্লেখ নেই। রীয়াজের মতে, এই বিষয়গুলো সনদের মূল কাঠামোর অংশ নয় এবং সেগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান সংস্কারের এই প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুনর্গঠন করতে পারে। একতরফা ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে বহুমুখী শাসনব্যবস্থা গড়ে তুললে দলীয় সমন্বয় ও নীতি নির্ধারণে নতুন গতিপথ উন্মোচিত হবে।
গণভোটের নির্ধারিত তারিখ ও পদ্ধতি এখনও চূড়ান্ত করা বাকি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়সূচি প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রীয়াজ আশাবাদী যে, স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
এই সংস্কার প্রক্রিয়ার সফলতা দেশের আন্তর্জাতিক চিত্রকেও শক্তিশালী করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। সংবিধানের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হলে আইনি নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে।
অবশ্যই, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছু সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি রয়ে গেছে। কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দেন, সনদের কিছু ধারা বাস্তবায়নে আইনগত বাধা ও রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দিতে পারে।
তবে রীয়াজের মতে, দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার ফলস্বরূপ গৃহীত সনদে সর্বোচ্চ সমঝোতা অর্জিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ সরকারকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে সহায়তা করবে।
সংবিধান সংস্কারের এই মাইলফলক শেষ না হয়ে, গণভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে। দেশের শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এই গণভোটের গুরুত্ব অপরিসীম।



