মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল তার সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে একটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি কানাডিয়ান সরকারকে চীন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা না করলে “গিলে খাবে” বলে হুমকি দেন। একই সময়ে তিনি গ্রিনল্যান্ডে পরিকল্পিত “গোল্ডেন ডোম” নামে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করেন, যা ইসরায়েলের আইরন ডোম প্রযুক্তির অনুকরণে তৈরি হওয়ার কথা।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গোল্ডেন ডোম গ্রিনল্যান্ডের আকাশকে শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থেকে রক্ষা করবে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডিয়ান সরকারকেও নিরাপত্তা প্রদান করবে। এই প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ও বেসামরিক অংশীদারদের সমন্বয়ে গড়ে তোলার কথা, এবং এর খরচ ও প্রযুক্তিগত বিশদ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ট্রাম্পের সতর্কবার্তা সত্যিকারের হুমকি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে; তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখে বলেন, কানাডিয়ান সরকার যদি মার্কিন সরকারের সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয় না করে, তবে চীন সরকার “সরাসরি কানাডিকে গিলে ফেলবে”। তিনি যুক্তি দেন, কানাডি নেতৃত্বের চীন সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
গোল্ডেন ডোমের রক্ষাকবচের ব্যাপারে ট্রাম্পের দাবি ছিল, এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের নয়, কানাডিয়ান সরকারকেও আকাশীয় হুমকি থেকে রক্ষা করবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, কানাডি সরকার চীন সরকারের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বাড়াতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্য গুরুতর বিপদ ডেকে আনবে। এই মন্তব্যের পর কানাডিয়ান সরকারকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এককভাবে অবস্থান করতে হবে বলে তিনি জোর দেন।
ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বেও আলোকপাত করেন; তিনি ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নিতে চান, যাতে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীন সরকারের প্রভাবের মোকাবিলা করা যায়। এই প্রস্তাবটি ডেনমার্ক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তীব্র সমালোচনা পেয়েছে, কারণ এটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
ড্যাভসের এক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামে ট্রাম্পের বক্তব্য আরও তীব্র হয়; তিনি উল্লেখ করেন, কানাডি সরকার আজ টিকে আছে কেবল মার্কিন সরকারের সমর্থনের কারণে। এই মন্তব্যের ফলে কানাডিয়ান সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে, এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়ায়।
কানাডিয়ান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর মার্ক কার্নি ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কানাডির সাফল্য কোনো প্রতিবেশী দেশের দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়, এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে গড়া বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এখন ভাঙনের মুখে। কার্নি আরও উল্লেখ করেন, কানাডি স্বতন্ত্র নীতি অনুসরণ করবে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের স্বার্থ রক্ষা করবে।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ায় তিনি তার নবগঠিত “বোর্ড অফ পিস” থেকে মার্ক কার্নির কানাডিয়ান সরকারকে আমন্ত্রণ বাতিল করে দেন। এই পদক্ষেপটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাতে পারে এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক আলোচনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চীন সরকারের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই বিতর্কে মন্তব্য করে বলেন, চীন সরকারকে কোনো হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি যুক্তি দেন, মার্কিন সরকার চীনকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নিজের নীতি সমর্থন করার জন্য একধরনের মনগড়া বয়ান তৈরি করছে। গুও জিয়াকুনের এই বক্তব্য চীন সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রাম্পের মন্তব্যকে অস্বীকার করে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, ট্রাম্পের এই ধারাবাহিক মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডিয়ান সরকারের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়াতে পারে, যা গ্রিনল্যান্ডের গোল্ডেন ডোম প্রকল্পের বাস্তবায়নেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি, চীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয় দেশের কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে। ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান হবে, তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক পরিবেশের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



