রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে, ফলে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) খাতে প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর একনেক সভায় অনুমোদিত হয় এবং মূল বাজেট ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা নির্ধারিত ছিল, সমাপ্তি সময়সীমা ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। এখন সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী মোট ব্যয় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, তবে জিওবি অংশে ১৬৬ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে।
প্রকল্পের অনুমোদনের সময় ডলার রূপান্তর হার ১ মার্কিন ডলারে ৮০ টাকা ধরা হয়েছিল। তবে গত নয় বছরে রেট ১২২.৪০ টাকায় পৌঁছায়, ফলে বৈদেশিক ঋণের টাকার পরিমাণ বাড়ে এবং প্রকল্পের মোট ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এই মুদ্রা পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনা করে সংশোধিত ডিপিপিতে বিভিন্ন খাতে ব্যয় পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, যাতে আর্থিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
সংশোধিত প্রস্তাবে মোট ৩৪টি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং ৪৯টি খাতে হ্রাস করা হয়েছে। জনবল, ভূমি অধিগ্রহণ ক্ষতিপূরণ, বিদ্যুৎ বিল এবং পরামর্শক ফি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাশ্রয় করা হয়েছে, যা জিওবি অংশে উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় ঘটিয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত প্রয়োজন মেটাতে দশটি নতুন খাতও সংযোজন করা হয়েছে।
ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের সময়সীমা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নের বাস্তবতা বিবেচনা করে নেওয়া হয়েছে। অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা চুক্তি, পাশাপাশি খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য আলোচনাও চলছে, যাতে প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত হয়।
রাশিয়ান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিদেশি কর্মী ও তাদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে গ্রিনসিটি আবাসিক এলাকার অসমাপ্ত ভবন সম্পন্ন করা এবং প্রায় ৬.০৬ একর নতুন জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। এই পদক্ষেপগুলো কর্মী কল্যাণ ও প্রকল্পের কার্যকরী পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
ব্যয় পুনর্নির্ধারণের ফলে জাতীয় বাজেটের ওপর সরাসরি চাপ কিছুটা কমেছে, যদিও মোট প্রকল্প ব্যয় বাড়লেও সরকারী তহবিলের ব্যবহার আরও কার্যকর হয়েছে। সাশ্রয়কৃত অর্থ দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহের নিরাপত্তা ও মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ বাংলাদেশ সরকারের শক্তি মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ঘাটতি কমানো এবং গ্রিন এনার্জি লক্ষ্য অর্জনে। প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি মিশ্রণে পারমাণবিক শক্তির অংশ বাড়িয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার কৌশলগত উদ্যোগের অংশ।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ডলার রেটের ওঠানামা প্রকল্পের আর্থিক কাঠামোতে প্রভাব ফেলেছে, তাই সংশোধিত পরিকল্পনায় ঝুঁকি প্রশমনের জন্য আর্থিক রিজার্ভ এবং মুদ্রা হেজিং ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত মুদ্রা পরিবর্তনের প্রভাব কমিয়ে প্রকল্পের আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াবে।
প্রকল্পের ব্যয় পুনর্বিন্যাসে জনবল ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং পরামর্শক ফি হ্রাসের মাধ্যমে খরচ কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন সংযোজিত দশটি খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে।
ডিপিপি অনুযায়ী অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে আলোচনার ধাপ অগ্রসর হয়েছে। এই চুক্তি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকরী দক্ষতা, নিরাপত্তা মান এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ সরকারের শক্তি নীতি অনুযায়ী পারমাণবিক শক্তি দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি দূর করতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মূল উপাদান। রূপপুর প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে শিল্প ও গৃহস্থালী খাতে সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
ভবিষ্যতে প্রকল্পের সময়সূচি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থার তত্ত্বাবধান এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত অডিট চালু করা হবে। এই ব্যবস্থা প্রকল্পের ঝুঁকি হ্রাস, বিনিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি এবং দেশের পারমাণবিক শক্তি খাতের আন্তর্জাতিক সুনাম উন্নত করবে।



