আর্কটিকের নিরাপত্তা ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদে রাশিয়া ও চীনকে সীমিত করার পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র আলোচনায় লিপ্ত হয়েছে। এই আলোচনায় গ্রিনল্যান্ডের জিঙ্ক, সোনা, লোহার ধাতু এবং বিরল খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রস্তাব উঠে এসেছে। ন্যাটোর মধ্যে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কারণ দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনসহ বড় শক্তির কৌশলগত দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যাটো সভায় নন-ন্যাটো দেশগুলোকে গ্রিনল্যান্ডে নতুন খনন কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার এবং বিদ্যমান লাইসেন্সের তদারকি কঠোর করার সুপারিশ করা হয়েছে। সদস্য দেশগুলো উল্লেখ করেছে যে, খনিজ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য আর্কটিকের পরিবেশ রক্ষা এবং বৃহৎ শক্তির স্বার্থের সংঘাত রোধ করা।
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড জিঙ্ক, সোনা, লোহার ধাতু এবং বিরল ধাতু সহ বিভিন্ন মূল্যবান সম্পদে সমৃদ্ধ। তবে এই সম্পদের মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মত বড় দেশগুলোর স্বার্থের টানাপোড়েন দেখা দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও পরিবেশগত সুরক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদ উল্লেখ করে দ্বীপটি কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, রাশিয়া ও চীন থেকে দ্বীপটি রক্ষা করতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ট্রাম্পের এই মন্তব্য ন্যাটো আলোচনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আর্কটিক নীতি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দেখা যাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম দাভোসে ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে দ্বীপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিরাপত্তা বিনিময়ে গ্রিনল্যান্ডের কিছু প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার দাবি করার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন।
গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘সুরক্ষা’ যুক্তিকে স্বাগত জানায়নি। গ্রিনল্যান্ডের খনিজ মন্ত্রণালয়ের প্রধান নাজা নাথানিয়েলসেন জোর দিয়ে বলেছেন যে, দ্বীপের সম্পদ উন্নয়ন বিদেশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও স্থানীয় আইনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ডেনমার্ক সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের ওপর কোনো বাহ্যিক সামরিক হুমকি নেই। ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের দাবি সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করে, আর্কটিকের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারস্পরিক সম্মান প্রয়োজন। এই অবস্থান ন্যাটোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিরোধিতা বাড়িয়ে তুলেছে।
চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ও চীনকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আর্কটিকের ওপর নিজের আধিপত্য বাড়াতে চায়। বেইজিং সরকার এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরে, আর্কটিকের সম্পদ ভাগাভাগি ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সমন্বিত পদ্ধতির আহ্বান জানায়। চীন এই আলোচনায় রাশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পদক্ষেপকে সমালোচনা করছে।
রাশিয়া প্রথম থেকেই গ্রিনল্যান্ডের প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উল্লেখ করেছেন যে, গ্রিনল্যান্ড রাশিয়ার নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, গ্রিনল্যান্ডের সম্পদ রাশিয়ার জন্য লাভজনক নয় এবং তাই রাশিয়া এই বিষয়ে সক্রিয় হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করছে না।
ডেনমার্কে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্লাদিমির বারবিনও একই রকম মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার নিজস্ব আর্কটিক অঞ্চলে প্রচুর তেল, গ্যাস, তামা এবং সোনার মজুদ রয়েছে, তাই গ্রিনল্যান্ডের সম্পদ রাশিয়ার জন্য অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন করে না। এই বক্তব্য রাশিয়ার আর্কটিক নীতি ও সম্পদ কৌশলকে স্পষ্ট করে।
ন্যাটোর মধ্যে চলমান এই আলোচনার ফলাফল ভবিষ্যতে আর্কটিকের নিরাপত্তা কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রহ, রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত অবস্থান এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার প্রচেষ্টা একসঙ্গে আর্কটিকের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠন করতে পারে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে এই জটিল পরিস্থিতিতে সমন্বিত নীতি নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।



