গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক নীতি আর্থিক বাজার, বাণিজ্য, কর ব্যবস্থাপনা, মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব সংগ্রহ, জ্বালানি সরবরাহ এবং বস্ত্র শিল্পের চাপের কেন্দ্রে ছিল। সাতটি প্রধান ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ দেখায় যে ম্যাক্রো‑ফাইন্যান্সিয়াল স্থিতিশীলতা, নীতি সমন্বয় এবং সেক্টরীয় চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। এই ঘটনাগুলো পরস্পর সংযুক্ত, ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংকগুলো পারস্পরিক বন্ড ক্রয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দেখায় কাগজে মূলধন অনুপাত বাড়ে, তবে নতুন বাহ্যিক তহবিলের প্রবাহ ঘটছে না। এই পদ্ধতি মূলধনের গুণগত মানকে হ্রাস করে এবং ঝুঁকি একত্রিত করে, ফলে ব্যাংকিং সিস্টেমের স্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করেন যে, বন্ড বাজারের স্বচ্ছতা না থাকলে তহবিলের প্রকৃত উৎস ও ব্যবহার নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যায়।
যদি কোনো ঋণদাতা ডিফল্ট করে, তবে সংহত ঝুঁকি দ্রুত সংক্রমণ ঘটিয়ে পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই সম্ভাবনা ব্যাংকগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়, যা সিস্টেমিক ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বন্ড লেনদেনের তদারকি ও তহবিলের প্রকৃত প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুতো আমদানি নীতি পরিবর্তনের প্রস্তাবের ফলে মধ্যম‑থেকে মোটা সুতোয়ের ডিউটি‑ফ্রি আমদানি বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে রপ্তানি‑মুখী গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা প্রদান করা। তবে রেডি‑মেড গার্মেন্টস রপ্তানিকারকরা এই নীতির বিরোধিতা করে, কারণ তারা স্থানীয় ইনপুটের দামের বৃদ্ধিকে সরাসরি ক্ষতি হিসেবে দেখছে।
রপ্তানিকারকরা সতর্ক করে যে, স্থানীয় ইনপুটের দাম বাড়লে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ক্ষতি হবে, বিশেষ করে যখন গ্লোবাল দামের চাপ বাড়ছে। তারা যুক্তি দেন যে, ডিউটি‑ফ্রি সুবিধা না থাকলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাবে। অন্যদিকে, স্পিনিং মিলগুলো সুরক্ষার জন্য এই নীতি সমর্থন করছে, কারণ তারা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে সুবিধা পাবে।
ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য অনলাইন ফাইলিং বাধ্যতামূলক হলেও, রিফান্ড প্রক্রিয়া এখনও পুরনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে চলছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এখনো ইলেকট্রনিক রিফান্ড সিস্টেম চালু করেনি, ফলে অতিরিক্ত পরিশোধিত করের ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অদক্ষতা বহু করদাতার জন্য আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং কর ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় করছে।
মুদ্রাস্ফীতি সাম্প্রতিক কঠোর মুদ্রা নীতি সত্ত্বেও উচ্চমাত্রায় স্থায়ী রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয় ও দুর্বল ঋণদাতাদের সমর্থন আর্থিক শিথিলতা বাড়িয়ে দেয়, যা প্রচলিত টাইটেনিং প্রভাবকে নষ্ট করে। পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলে গঠনমূলক বাধা এবং দুর্বল আর্থিক শৃঙ্খলা মূল্যবৃদ্ধি দমনকে কঠিন করে তুলছে। এই পরিস্থিতি মুদ্রা নীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যে জটিল সমন্বয় প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রথমার্ধে FY2025-26-এ বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধি অর্জন করলেও, মধ্যবছরের লক্ষ্য থেকে প্রায় ৪৬,০০০ কোটি টাকা কমে গেছে। বিনিয়োগের ধীর গতি এবং কর সংগ্রহের কাঠামোগত সমস্যাই এই ঘাটতির মূল কারণ। ফলে রাজস্ব লক্ষ্য পূরণে অতিরিক্ত নীতি সমন্বয় এবং করদাতার সম্মতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, ব্যাংকিং সেক্টরের মূলধন গুণমান উন্নয়ন, কর রিফান্ডের ডিজিটালাইজেশন এবং বস্ত্র শিল্পের ন্যায্য ইনপুট নীতি ছাড়া ম্যাক্রো‑ফাইন্যান্সিয়াল স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন। নীতি নির্ধারকদের জন্য এখনই ঝুঁকি হ্রাস, তহবিলের স্বচ্ছতা এবং ট্যাক্স প্রশাসনের আধুনিকীকরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্রগুলোতে কাঠামোগত সংস্কার না হলে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে।



