বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের আমির শফিকুর রহমান গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী এসএম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শনিবার সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত জনসভায় দেশের উত্তরভাগের উন্নয়নের পরিকল্পনা ও আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের জন্য আহ্বান জানালেন। তিনি উল্লেখ করেন, উত্তরবঙ্গের মানুষ উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান খোঁজে রাজধানীর দিকে ঝুঁকছে; এ পরিস্থিতি বদলাতে তিনি যুবকদের বেকার ভাতা না দিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন।
শফিকুর রহমানের মতে, গত পনেরো বছর ধরে দেশ ফ্যাসিবাদের প্রভাবের অধীনে কষ্ট পেয়েছে; তিনি নিজেকে নির্যাতিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করে, যারা বাবা হারিয়ে এতিম হয়েছে, তাদের কণ্ঠ শোনাতে এসেছেন। তিনি দশটি দলের সমর্থনে তাদের সান্ত্বনা জানিয়ে, তিনটি পূর্বের নির্বাচনে যুবসমাজ ও সাধারণ জনগণ ভোট দিতে পারেনি বলে উল্লেখ করে, এবার ভোটের মাধ্যমে পুরনো দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দূর করার আহ্বান জানালেন।
রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে ৫৪ বছরের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অত্যাচার দূর করা হবে। তিনি ভোটের পক্ষে জোয়ার তুলতে এবং পুরনো ব্যবস্থাকে ভাসিয়ে দিতে প্রচেষ্টা চালাতে বললেন। এই আহ্বানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে মন্তব্যের অপেক্ষা রয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়নি।
উত্তরবঙ্গের শিল্পায়নের পরিকল্পনা শফিকুরের মূল অগ্রাধিকারে রয়েছে। তিনি বলছেন, উত্তরবঙ্গকে সম্পূর্ণ শিল্পকেন্দ্রিক এলাকা বানাতে চান, তবে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার দুইটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন: মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজি। তিনি চাঁদাবাজদের নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, তাদেরকে সমাজের সম্মানিত সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে তিনি ধারাবাহিকভাবে মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। শফিকুরের মতে, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে, যাতে প্রত্যেক অঞ্চলে আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌঁছায়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রাখছেন।
শফিকুরের বক্তব্যে যুবকদের জন্য বেকার ভাতা না দিয়ে দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার উল্লেখ ছিল। তিনি বলছেন, প্রশিক্ষণ শেষে যুবকরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গৌরবের সঙ্গে কাজ করবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তিনি শিল্পখাতের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের ভূমিকা কমিয়ে, সরাসরি কৃষক ও ক্রেতার মধ্যে লেনদেন সহজ করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। এই নীতি বাস্তবায়নে তিনি আইনগত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন।
জনসভায় উপস্থিত নেতা-কর্মীদের প্রতি শফিকুরের সমর্থনসূচক বক্তব্যও ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু নেতা জেল খেয়েছেন, তবে তারা দেশ ত্যাগ করেননি; বরং তারা এই মাটিকে ভালোবাসে। তিনি তাদের সঙ্গে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে আশ্বাস দেন।
শফিকুরের বক্তৃতা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে জামায়াতের নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি ভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানিয়ে, পার্টির ভিত্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জনসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করছেন। তবে এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
গাইবান্ধা র্যালি শেষে উপস্থিত ভক্ত ও সমর্থকরা শফিকুরের প্রতিশ্রুতি নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, যদি সরকারী নীতি অনুযায়ী শিল্পায়ন ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন হয়, তবে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে। তবে কিছু অংশে তারা চাঁদাবাজি নির্মূলের বাস্তবিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন।
রহমানের বক্তৃতা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তিনি ভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানিয়ে, পুরনো দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলাফল কীভাবে গঠিত হবে, তা দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই র্যালি এবং শফিকুরের পরিকল্পনা দেশের উত্তরবঙ্গের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি রোডম্যাপ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক, প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো গড়ে তোলা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। সময়ই বলবে, এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ নেবে।



