পাকিস্তানের কায়বের পাখতুনখোয়া প্রদেশের চিত্রল জেলায় শুক্রবার বিকেলে তীব্র তুষারপাতের পর একটি বাড়ি ধসে অন্তত নয়জনের প্রাণ নেওয়া হয়েছে। মৃতদের মধ্যে পরিবার প্রধান বাচা খান, তার স্ত্রী, তিনজন পুত্র, দুইজন কন্যা এবং দুইজন গৃহকর্মী অন্তর্ভুক্ত। মাত্র নয় বছর বয়সী একটি শিশুই বেঁচে গিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল ছিল চিত্রলের দামিল উপবিভাগের সেরিগাল গ্রাম, যেখানে তুষারধসের ফলে বাড়ির মধ্যম কক্ষের ছাদ ভেঙে গিয়ে পুরো কাঠামো ধসে যায়। স্থানীয় সময়ে সন্ধ্যায় পরিবারটি রাতের খাবার খাচ্ছিল, তখন হঠাৎ গাছের শিকড়ে জমে থাকা ২০ ইঞ্চি (প্রায় ৫০ সেমি) উচ্চতার তুষার গড়িয়ে এসে বাড়ির ওপর আঘাত করে।
স্থানীয় প্রশাসনের মতে, তীব্র তুষারপাতের পর থেকে চিত্রল উপত্যকায় ধারাবাহিকভাবে তুষারপাত অব্যাহত রয়েছে, যা ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলেছে। এই পরিস্থিতি রাস্তায় গাড়ি চলাচলকে কঠিন করে তুলেছে; লোয়ারি চিত্রল ও আপার চিত্রল উভয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রধান সড়ক বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে লোয়ারি টানেলের প্রবেশদ্বার সংযুক্ত সড়ক প্রায় ১৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকায় হাজার হাজার যাত্রী আটকে গিয়েছিল, তবে শুক্রবার সন্ধ্যায় তুষার পরিষ্কারের কাজ শেষ হওয়ার পর গতি পুনরায় শুরু হয়েছে।
চিত্রল জেলায় তুষারধসের পাশাপাশি ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ার কথা স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। একই সময়ে কায়বের পাখতুনখোয়া, বেলুচিস্তান, গিলগিট-বালতিস্তান ও আজাদ কাশ্মীরেও ভারী তুষারপাতের ফলে সড়ক বন্ধ, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন এবং পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল সীমিত হয়েছে। শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা নেমে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
পাকিস্তানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (NDMA) তৎক্ষণাৎ উদ্ধার ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে গিয়ে স্থানীয় রেসকিউ দলকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। তুষারধসে ধসে পড়া বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছে এবং মৃতদেহের শনাক্তকরণ কাজ চলছে। বেঁচে থাকা শিশুটিকে নিকটস্থ হাসপাতালের তীব্র সেবার অধীনে রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ধরনের শীতকালীন দুর্যোগকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের অংশ হিসেবে উল্লেখ করছেন। এক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “হিমবাহ গলনের ফলে তুষারপাতের তীব্রতা ও পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পাহাড়ি অঞ্চলে তুষারধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।” একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা সংস্থা (USAID) এবং জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় অফিস (OCHA) এই অঞ্চলে সম্ভাব্য মানবিক সংকটের দিকে নজর দিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই দুর্যোগের প্রভাব কেবল মানবিক নয়, বরং কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। চিত্রল জেলাটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তের নিকটে অবস্থিত, যেখানে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক রুটের সংযোগ রয়েছে। তীব্র তুষারপাত ও সড়ক বন্ধের ফলে সীমান্ত পারাপার ও সামরিক সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, যা উভয় দেশের নিরাপত্তা নীতিতে অতিরিক্ত চাপের কারণ হতে পারে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে তুষারধসের পরিণতি মোকাবিলার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়ার সম্ভাবনা উন্মুক্ত করেছে। একই সঙ্গে, চীন ও ইরানের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখতে সমন্বয় বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় জনগণ তীব্র শীতের মধ্যে মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করছে; তাপ সরবরাহের ঘাটতি, খাবার ও জ্বালানির অভাব বাড়ছে। সরকারী ও বেসরকারি সংস্থাগুলো জরুরি শেল্টার ও খাবার বিতরণে ত্বরান্বিত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই ঘটনা শীতকালীন দুর্যোগের মোকাবিলায় পূর্ব প্রস্তুতির গুরুত্বকে আবারও তুলে ধরেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে তুষারধসের পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল গঠন করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবিক ক্ষতি কমানো যায়।
চিত্রল জেলায় তীব্র তুষারপাতের ফলে সৃষ্ট এই তুষারধসের পরিণতি শুধু স্থানীয় জনগণকে নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও মানবিক অবস্থাকে প্রভাবিত করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত সহায়তা ও দেশীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণই এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হবে।



