ময়মনসিংহ জেলা, প্রায় দুইশত পঞ্চাশ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধিকারী, দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, তবে পর্যটন মানচিত্রে এখনও যথাযথ স্থান পায়নি। ব্রহ্মপুত্রের স্রোত, হালুয়াঘাট ও ধোবাউরার সবুজ পাহাড় এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য মেলা একসাথে মিলে একটি অনন্য পরিবেশ গড়ে তুলেছে, যা শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য ক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ প্রদান করতে পারে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ময়মনসিংহের লোকসংগীত, গ্রাম্য গীতিকা এবং পুরনো রীতি-নীতি অঞ্চলের পরিচয় গড়ে তুলেছে। এই সাংস্কৃতিক ধারা স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ঐতিহ্য সংরক্ষণে অংশ নিতে পারে।
বহু ঐতিহাসিক নিদর্শনও ময়মনসিংহে অবস্থিত। জয়নুল আবেদিনের শিল্প সংগ্রহশালা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) বিশাল ক্যাম্পাস, শশি লজ, গৌরিপুর রাজবাড়ি এবং নজরুল সংক্রান্ত স্মৃতিস্তম্ভগুলো শিল্প, সাহিত্য ও শিক্ষার দীর্ঘ ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। এসব স্থান শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও প্রকল্প কাজের জন্য আদর্শ ক্ষেত্র সরবরাহ করে।
পর্যটন গবেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞের মতে, ময়মনসিংহের সমৃদ্ধ ইতিহাস, স্বতন্ত্র লোকসংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী পর্যটন শহরে রূপান্তরের শক্তিশালী ভিত্তি গঠন করে। তবে পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাবে এই সম্ভাবনা এখনও পূর্ণভাবে ব্যবহার করা যায়নি।
শহরের শিল্প গ্যালারি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করতে সক্ষম, এবং বিএইউ ক্যাম্পাসের বিশাল এলাকা, উদ্যান, গার্মপ্লাজম সেন্টার এবং কৃষি জাদুঘর শিক্ষার্থীদের গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে। এই সুবিধাগুলোকে শিক্ষামূলক ট্যুরের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা একসাথে ক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষা অর্জন করতে পারবে।
স্থানীয় খাবার, বিশেষ করে মুকতাগড়া মন্ডা, খাদ্য পর্যটনের ক্ষেত্রে বড় সম্ভাবনা রাখে। খাবারের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও ঐতিহ্যবাহী রেসিপি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হ্যান্ডস-অন কর্মশালার বিষয়বস্তু হতে পারে, যা ছাত্রদের স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করে।
প্রাচীন শহর হিসেবে ১৭৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহ, ২৩৮ বছর বয়সী একটি জেলা, যার পর্যটন সম্ভাবনা বিশাল। তবে পর্যাপ্ত নীতি ও পরিকল্পনা না থাকায় এই সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি। সরকার ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ১১টি সরকারি স্বীকৃত প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটের তালিকা রয়েছে, তবু বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সেগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা কম।
এই ঘাটতি দূর করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্পে যুক্ত করা জরুরি। শিক্ষার্থীরা সাইট ভিজিট, ডকুমেন্টেশন এবং গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে ঐতিহাসিক জ্ঞান অর্জন করতে পারে, যা একইসঙ্গে পর্যটন প্রচারেও সহায়ক হবে।
পর্যটন উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মূল বিষয়গুলো হল: সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয়। এসব পদক্ষেপ একসাথে বাস্তবায়িত হলে ময়মনসিংহের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে পরিচিত করা সম্ভব হবে।
শিক্ষা দৃষ্টিকোণ থেকে শেষ কথা: যদি আপনি ময়মনসিংহের কোনো ঐতিহাসিক সাইট বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র পরিদর্শন করেন, তবে স্থানীয় গাইডের সঙ্গে আলোচনা করে ঐতিহ্য সংরক্ষণে আপনার ভূমিকা কী হতে পারে তা ভাবুন। আপনার ছোট্ট উদ্যোগই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।



