ডিসেম্বর ১১ তারিখে গাজারিয়া উপজেলা, মুন্সিগঞ্জে অবস্থিত API (Active Pharmaceutical Ingredients) ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রবেশের সময় প্রথমে এক ধরনের নস্টালজিক অনুভূতি হয়, তবে বাস্তবতা দ্রুতই ভিন্ন রূপ নেয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের পাশে ৫০ কিলোমিটার দূরে এই পার্কের চারপাশে সুশৃঙ্খল পাকা রাস্তা ও আম গাছের সারি রয়েছে, তবে সেগুলোই এখনো প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যায়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৬টি প্লটে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে বসতি স্থাপন করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে মাত্র কয়েকটি ভবনই সম্পন্ন হয়েছে। বাকি জমিগুলো জঙ্গলে পরিণত, কোনো নির্মাণের চিহ্ন দেখা যায় না এবং কর্মীর উপস্থিতি খুবই সীমিত। পার্কের পরিবেশে নীরবতা বিরাজমান, যা প্রত্যাশিত ঔষধ শিল্পের উদ্ভাবনী কেন্দ্রের চিত্রের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
হেলথকেয়ার ফর্মুলেশনস লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. হালিমুজ্জামান উল্লেখ করেন, তিনি প্রকল্পে ভাল বিশ্বাসে বিনিয়োগ করেছেন, তবে এখন আর্থিক চাপে আছেন। তিনি বলেন, পার্কে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পর দৈনিক ২০ লাখ টাকার ঋণ কিস্তি পরিশোধে বাধা পড়ছে। এই আর্থিক বোঝা কোম্পানির ক্যাশ ফ্লোকে কঠিন করে তুলেছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
পার্কের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে কাঁচামাল (API) আমদানি কমিয়ে স্বদেশে উৎপাদন বাড়ানো, যাতে ঔষধের মূল্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়। তবে প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার দুই দশক পার হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চলছে। ভূমি উন্নয়ন ও সড়ক নির্মাণের কাজ মূলত শেষ হয়েছে, তবে গ্যাসসহ মৌলিক ইউটিলিটি সরবরাহ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প বর্তমানে দেশীয় চাহিদা পূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করে। তবু এই সাফল্যের পেছনে একটি গঠনমূলক দুর্বলতা রয়ে গেছে: API উৎপাদনের স্বল্পতা। বর্তমানে প্রায় ৮৫ শতাংশ API ভারত ও চীনের মতো দেশ থেকে আমদানি করা হয়, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি তৈরি করে।
বছরের পর বছর লিডারশিপের অধীনে LDC (Least Developed Country) স্ট্যাটাসের সুবিধা ও বৌদ্ধিক সম্পত্তি সংক্রান্ত নমনীয়তা বাংলাদেশকে এই নির্ভরতা থেকে রক্ষা করেছে। তবে এই বছর দেশের LDC স্ট্যাটাস সমাপ্তি ঘটবে, ফলে ট্রেড প্রিফারেন্স ও IP ফ্লেক্সিবিলিটি হারিয়ে যাবে। এই পরিবর্তন API আমদানি খরচ বাড়াবে এবং স্থানীয় উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা তীব্র করবে।
API পার্কের ধীর অগ্রগতি এবং মৌলিক অবকাঠামোর ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করেছে। ঋণ পরিশোধের উচ্চ ব্যয় এবং প্রকল্পের অপ্রতুলতা কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে, সরকারী নীতি পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা API সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অবস্থার উন্নতির জন্য অবিলম্বে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের মতো মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া, পার্কের অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। নীতিনির্ধারকদের উচিত পার্কের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও কর সুবিধা প্রদান করে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ানো।
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য API উৎপাদনকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে গৃহীত করা প্রয়োজন। যদি পার্কের উন্নয়ন দ্রুত না হয়, তবে দেশীয় ঔষধের মূল্যে বৃদ্ধি, রপ্তানি সক্ষমতার হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
সারসংক্ষেপে, API পার্কের ধীরগতি এবং মৌলিক সুবিধার অভাব বিনিয়োগকারীর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে, আর দেশের স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে এই প্রকল্পের ত্বরিত বাস্তবায়ন অপরিহার্য। ভবিষ্যতে নীতি পরিবর্তন ও অবকাঠামো উন্নয়নের সমন্বয়ই পার্ককে সফল করে তুলতে পারে।



