পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাতের দিকে ২০টি মাছ ধরার নৌকা থেকে প্রত্যেক নৌকা থেকে একজন করে মোট বিশজন জেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। নৌকাগুলোকে টার্গেট করে একদল পরিচিত জলদস্যু দল সদস্যরা কাজ সম্পন্ন করে, তবে এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
অভিযুক্ত দলের নেতৃত্বে ছিলেন ‘ভেটো’ সফিকুল এবং শাহাজান, যাদের পূর্বে র্যাবের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ‘ডন বাহিনী’ নামে আবার দস্যু কার্যক্রমে লিপ্ত হওয়া দেখা যায়। এই দুইজনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সদস্যের নাম এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে তাদের কার্যক্রমের পটভূমি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের কারণ।
অপহরণের সময় জেলেরা সুন্দরবনের মাহমুদা নদী, চুনকুড়ি ও মালঞ্চ নদীর বিভিন্ন অংশে কাজ করছিল। রাতের অন্ধকারে জলদস্যু দল নৌকা থেকে একেকজন জেলেকে তাড়া করে নিয়ে যায় এবং র্যানসমের শর্ত হিসেবে প্রত্যেকের জন্য ৪০,০০০ টাকা দাবি করে। দাবি করা অর্থের পরিমাণের ভিত্তিতে তারা মুক্তিপণ সংগ্রহের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।
অপহৃতদের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তারা হলেন সাদেক আক্কাস, আবু তাহের, রাজেত আলী, নজরুল গাইন, শুকুর আলী, আবুল কালাম, আশিকুল, হাফিজুর, আসাদুল, আমজাদ আলী, ইউসুফ আলী এবং মিলন হোসেন। এই সব নামের জেলেরা শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা, যাঁদের পরিবার এখন উদ্বেগে ভুগছে। বাকি আটজনের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি, ফলে তাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপহরণ ঘটার প্রায় এক সপ্তাহ আগে, এই জেলেরা কদমতলা স্টেশন থেকে অনুমতিপত্র (পাস) নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়েছিল। অনুমতি পেয়ে ফিরে আসার পর, রাতের বেলা দোবেকী কোস্টগার্ড অফিসের সংলগ্ন এলাকায় এবং বিভিন্ন খাল থেকে ২০টি নৌকা থেকে একেকজন করে জেলেকে তুলে নেওয়া হয়। অপহৃতদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল নম্বর প্রদান করা হয়, যেখানে র্যানসমের শর্ত জানানো হয়।
অপহৃতদের আত্মীয়স্বজনেরাও মিডিয়াতে নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক। তারা জানিয়েছে যে, জলদস্যুদের নির্ধারিত নম্বরে যোগাযোগ করলে প্রতিজনের জন্য ৪০,০০০ টাকা দিতে হবে এবং যদি পুলিশ বা কোস্টগার্ডকে জানানো হয় তবে অপহৃতদের প্রাণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই হুমকির মুখে আত্মীয়রা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে না জানিয়ে সরাসরি র্যানসমের পরিমাণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
শ্যামনগর উপজেলার হরিনগর গ্রামের মহাজন আকরাম হোসেন স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উত্থাপন করেন যে, গত তিন মাসের বেশি সময় ধরে সাতক্ষীরা রেঞ্জে জলদস্যু কার্যক্রম বাড়লেও তদনুযায়ী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, সুন্দরবন এখন দস্যুদের দখলে এবং বনজীবীরা নিরাপত্তাহীন অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের কদমতলা স্টেশন কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম জানান, তার স্টেশন থেকে পাস নিয়ে বনে গিয়ে ফিরে আসা কিছু জেলেরা এই ঘটনার শিকার হয়েছে। তিনি অতিরিক্ত তথ্য না দিয়ে কেবল জানিয়েছেন যে, অনুমতিপত্রের প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চলেছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো চলমান। স্থানীয় পুলিশ ও কোস্টগার্ডের তদন্ত দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রমাণ সংগ্রহ ও সন্দেহভাজনদের সনাক্তকরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, র্যানসমের পরিমাণ ও অপহরণ পদ্ধতি বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো গ্রেফতার বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের পরিবার নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। সরকারী ও নিরাপত্তা সংস্থার কাছ থেকে দ্রুত তদন্তের ফলাফল ও দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



