২০২৪ সালের ২৭ জানুয়ারি, ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন। রাষ্ট্রীয় ভোজ এবং আনুষ্ঠানিক আড়ম্বরের পাশাপাশি দুই নেতার আলোচ্যসূচিতে ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অগ্রসর হওয়া অন্যতম মূল বিষয়।
এই ভিজিটের সময়সূচিতে ভারত‑ইইউ বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতি বিশেষ গুরুত্ব পাবে, কারণ ভারত এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচিত। দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন।
ভূরাজনৈতিক পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল পরিকল্পনা নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি দেওয়া একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। পরবর্তীতে ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তিত হওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে নতুন বাণিজ্য কৌশল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক চ্যাথাম হাউসের গবেষক শীতেজ বাজপেয়ী উল্লেখ করেছেন যে, ভারতের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করার ইচ্ছা এই চুক্তির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ভারত তার বাণিজ্য নীতি পুনর্গঠন করে বৈশ্বিক বাজারে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায়।
বিভিন্ন সূত্রের মতে, ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে চুক্তি ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গয়াল উভয়েই এই চুক্তিকে “সবচেয়ে বড় চুক্তি” বলে বর্ণনা করেছেন, যা দুই দশকের কঠিন আলোচনার সমাপ্তি নির্দেশ করে।
চুক্তি কার্যকর হলে এটি ভারতের নবম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হবে, যা মাত্র চার বছরের মধ্যে অর্জিত হয়েছে। পূর্বে যুক্তরাজ্য, ওমান এবং নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, ফলে ভারত দ্রুতই বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য এই চুক্তি সাম্প্রতিক মেরকুসুর বাণিজ্য জোটের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপ ইতিমধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা এশিয়ার সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সংযোগকে শক্তিশালী করছে।
অর্থনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ইউনিটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সুমেধা দাশগুপ্ত উল্লেখ করেছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাণিজ্য পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে, ফলে উভয় পক্ষই নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজছে। ভারতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাব কমানো এবং ইউরোপের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
দাশগুপ্তের মতে, এই চুক্তি ভারতের দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে ভারত তার রপ্তানি বাজারকে বৈচিত্র্যময় করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে চুক্তি বাস্তবায়িত হলে শুল্ক হ্রাস এবং পণ্য প্রবেশের শর্ত সহজ হবে, যা উভয় দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যাল, অটোমোবাইল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে বাজারের প্রবেশাধিকার বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে চুক্তির রেটিফিকেশন প্রক্রিয়া, নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের সামঞ্জস্য এবং কিছু গৃহস্থালি গোষ্ঠীর বিরোধিতার মতো ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে। এই বিষয়গুলো সমাধান না হলে চুক্তির পূর্ণ প্রভাব অর্জনে সময়সীমা বাড়তে পারে।
সার্বিকভাবে, যদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং কার্যকর হয়, তবে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন গতিবিধি আনবে। ভবিষ্যতে আরও এশীয় দেশকে লক্ষ্য করে ইউরোপীয় বাণিজ্য নীতি গড়ে তোলার সম্ভাবনা বাড়বে।



