সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে তার নতুন শান্তি সংস্থা “বোর্ড অব পিস” উদ্বোধন করেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সংঘাত সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি বৈশ্বিক কাঠামো গঠন করা। তবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্ধেকেরই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকা প্রকাশ পায়, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনায় তীব্র প্রশ্ন তুলেছে।
দাভোসে অনুষ্ঠিত ভাস্কর্যপূর্ণ সমাবেশে ট্রাম্পের সংস্থার সূচনা করা হলেও, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নির্বাচন ও তার নিজস্ব অভিবাসন নীতির মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়। ট্রাম্পের দল সংস্থাটিকে “ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা” বলে গর্ব করে, তবে বাস্তবে এটি শুরু থেকেই বিশ্বাসযোগ্যতার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।
প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, বোর্ডের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান এবং উজবেকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। এই দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য মার্কিন সরকার ইতিমধ্যে অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা থাকা এই নাগরিকদের কীভাবে একটি আমেরিকান-নেতৃত্বাধীন শান্তি সংস্থার মূল অংশীদার হওয়া সম্ভব, তা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেশগুলোর তালিকায় আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং উজবেকিস্তান অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখযোগ্য যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো প্রধান দেশ এই তালিকায় দেখা যায়নি। একই সঙ্গে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
আর্থিক দিক থেকে বোর্ডের প্রত্যেক সদস্যকে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার অবদান রাখতে হবে, যা সংস্থার কার্যক্রম ও প্রকল্পের জন্য প্রাথমিক তহবিল হিসেবে নির্ধারিত। এই শর্তটি কিছু দেশকে আর্থিকভাবে চাপের মধ্যে ফেলতে পারে এবং সদস্যপদ গ্রহণে দ্বিধা সৃষ্টি করতে পারে।
ব্রিটিশ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে বোর্ডের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অতিরিক্ত সমালোচনা উত্থাপন করেছে। ব্লেয়ারের অংশগ্রহণকে কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন যে, তিনি শান্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবেন, তবে অন্যদিকে তার রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়েছে।
ট্রাম্প এই সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করে, এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি “যখন আমেরিকা সমৃদ্ধ হয়, তখন পুরো বিশ্ব সমৃদ্ধ হয়” এমন বক্তব্য দিয়ে সংস্থার গ্লোবাল প্রভাবের ওপর জোর দেন। তার এই মন্তব্যকে সমর্থকরা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে বিশ্ব শান্তির ভিত্তি হিসেবে দেখেন, তবে সমালোচকরা এটিকে স্বার্থপরতা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
সামগ্রিকভাবে, বোর্ড অব পিসের প্রথম সভায় ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার একটি নতুন পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, যা “নিউ গাজা” নামে পরিচিত। এই পরিকল্পনা গাজা অঞ্চলের পুনর্গঠন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি, তবে এর নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো প্রকাশিত হয়নি।
পরবর্তী পর্যায়ে, বোর্ডের সদস্য দেশগুলোকে আর্থিক অবদান প্রদান এবং কার্যকরী কাঠামো গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা নীতির পুনর্বিবেচনা করা হবে কিনা, তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। সংস্থার কার্যকারিতা ও স্বীকৃতি নির্ভর করবে এই নীতিগত দ্বন্দ্বের সমাধান এবং সদস্য দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর।



