পদ্মা সেতু, যা দেশের বৃহত্তম রেল‑রোড সেতু, নির্মাণের প্রায় সাড়ে তিন বছর পর সরকার ৩,০০০ কোটি টাকার টোল আয় রিপোর্ট করেছে। এই পরিমাণে সেতু থেকে প্রাপ্ত আয় প্রত্যাশিত টোল আয়ের তুলনায় কম, তবে মোট যানবাহন চলাচল পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেতু পরিচালনা করে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, যা একই সময়ে যমুনা, মুক্তারপুর সেতু এবং কর্ণফুলী টানেলসহ অন্যান্য অবকাঠামো তত্ত্বাবধান করে।
টোল আয়ের পূর্বাভাসের তুলনায় বাস্তব আয় কম হওয়ার প্রধান কারণ হল বড় মালবাহী যানবাহনের সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে কম। সেতু দিয়ে চলাচলকারী মোট যানবাহনের এক-তৃতীয়াংশ গাড়ি ও মোটরসাইকেল, আর বাস, ট্রাক ও অন্যান্য বড় যানবাহনের অংশ সীমিত। ফলে টোলের গড় হার পূর্বাভাসের নিচে নেমে এসেছে, যদিও মোট গাড়ি-চলাচল পূর্বাভাসের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, সেতুর দক্ষিণে পরিকল্পিত শিল্পায়ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সেতু নির্মাণের সময় দক্ষিণে বড় শিল্প পার্ক ও উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার ধারণা ছিল, তবে তা এখনো সঞ্চালিত হয়নি। ফলে সেতু থেকে প্রাপ্ত টোল আয় মূলধন পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
সেতুর উপস্থিতি জমির মূল্যে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এনেছে, বিশেষ করে সেতুর আশেপাশের নগর ও গ্রামীণ এলাকায়। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প‑বাণিজ্যিক গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় বৃদ্ধি পায়নি। সেতু নির্মাণের সময় ভারতীয় পণ্য পরিবহনের জন্য বেনাপোল স্থলবন্দর এবং মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ব্যবহার করা হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে এই রুটে কোনো উল্লেখযোগ্য ভারতীয় পণ্য প্রবাহ ঘটছে না।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অধীনে যমুনা সেতু টোল আদায়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে। অন্যদিকে কর্ণফুলী টানেল থেকে প্রাপ্ত আয় দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতে যথেষ্ট নয়, ফলে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। মুক্তারপুর সেতু ছোট আকারের হওয়ায় টোল আয় সীমিত, আর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পাবলিক‑প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলে গড়ে তোলা হয়েছে; এখানে টোলের আয় সরাসরি বিনিয়োগকারী সংস্থার কাছে যায়।
পদ্মা সেতু মুন্সিগঞ্জ ও শরীয়তপুরকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করে, ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ‑পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষ সেতুর সুবিধা পাচ্ছেন। সেতু পারাপারের সময় সব ধরনের যানবাহনকে টোল দিতে হয়, যা সরকারী আয় এবং সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ খরচে সরাসরি অবদান রাখে। তবে বড় মালবাহী যানবাহনের কম প্রবাহ টোল আয়ের গঠনকে প্রভাবিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সেতুর আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, টোল আয়ের ঘাটতি সেতু প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময়সূচি ও ভবিষ্যৎ PPP উদ্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিনিয়োগকারীরা সেতুর আয়-ব্যয় সমতা সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করছেন, বিশেষ করে কর্ণফুলী টানেল ও ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্পে। সরকারকে সেতুর দক্ষিণে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে নীতি সমর্থন, কর সুবিধা এবং লজিস্টিক্স অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে টোল আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, পদ্মা সেতু নির্মাণের পর টোল আয় ৩,০০০ কোটি টাকা হলেও তা পূর্বাভাসের তুলনায় কম, এবং আয়ের গঠন প্রধানত ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল। বড় মালবাহী যানবাহনের প্রবাহ ও দক্ষিণে শিল্পায়নের অভাব আয় বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে। সরকার ও সেতু কর্তৃপক্ষের জন্য এখন টোল আয় বাড়াতে শিল্প‑বাণিজ্যিক পরিবেশ উন্নয়ন, লজিস্টিক্স নেটওয়ার্ক সংহতকরণ এবং সম্ভাব্য PPP মডেল পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো সেতুর আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত করে ভবিষ্যৎ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।



