যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৩ জানুয়ারি তার নিজস্ব সামাজিক নেটওয়ার্ক ট্রুথ সোশ্যাল-এ পোস্ট করে জানিয়েছেন, যদি কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেছে নেয়, তবে বেইজিং এক বছরের মধ্যে কানাডাকে ‘গ্রাস’ করতে সক্ষম হবে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পটভূমি হল গ্রিনল্যান্ডে প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্প, যা তিনি প্রত্যাখ্যানের পর কানাডার প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কানাডা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক ভোট দিয়েছে, ফলে তার সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই মন্তব্যের আগে, ১৭ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) ট্রাম্প কানাডার প্রতি সমালোচনামূলক বক্তব্য রাখেন। তিনি যুক্তি দেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের থেকে নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন ‘ফ্রি সুবিধা’ পায়, যা তাকে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, তবে কানাডা তা স্বীকার করছে না। ট্রাম্পের মতে, কানাডার বর্তমান অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।
ডব্লিউইএফ-এ কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নতুন আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা এবং শুল্ককে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যকে পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রচেষ্টার প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
ট্রাম্পের সতর্কবার্তা এবং কানাডার প্রতিক্রিয়া একই সময়ে উঠে আসে, যখন কানাডা এবং চীন ১৭ জানুয়ারি একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুসারে, কানাডার ব্যবসা ও শ্রমিকদের জন্য সাত বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি বাজার উন্মুক্ত হবে বলে জানানো হয়েছে।
ট্রাম্পের পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রকল্প কেবল গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নয়, কানাডার সুরক্ষাও নিশ্চিত করবে। তবে কানাডা এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে, ফলে তার নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে।
ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফ্রি সুবিধা’ ছাড়া কানাডা টিকে থাকতে পারে না এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত গুরুত্বকে উপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে। তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রীকে ভবিষ্যতে তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা স্মরণ রাখতে আহ্বান জানান।
মার্ক কার্নি ডব্লিউইএফ-এ উল্লেখ করেন, বর্তমান মহাশক্তি প্রতিযোগিতার যুগে আন্তর্জাতিক নিয়মের দুর্বলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শুল্কের ব্যবহারকে চাপের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তার মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের পরিকল্পনার প্রতি পরোক্ষ সমালোচনা হিসেবে দেখা হয়।
কানাডা-চীন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর, কানাডার অর্থনৈতিক নীতি এবং নিরাপত্তা কৌশল উভয়ই পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের সতর্কতা এবং কানাডার নতুন বাণিজ্যিক পদক্ষেপের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের মন্তব্য কেবল রাজনৈতিক রেটোরিক নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে কানাডার সমন্বয়কে পুনরায় মূল্যায়নের আহ্বান। একই সঙ্গে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের সম্প্রসারণ কানাডার কূটনৈতিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
ডব্লিউইএফ-এ ট্রাম্পের বক্তব্যের পর, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি বিশেষজ্ঞরা কানাডার নিরাপত্তা নীতি এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তারা সতর্ক করেন, যদি কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টি থেকে বিচ্যুত হয়, তবে তা তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কানাডা সরকার এখনও ট্রাম্পের সতর্কবার্তা সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য দেয়নি, তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া জানায়, কানাডা-চীন চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে কানাডার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে রয়ে গেছে। ট্রাম্পের ‘এক বছরের মধ্যে গ্রাস’ মন্তব্যের বাস্তবতা এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রভাব আগামী মাসে স্পষ্ট হবে।



