বরিশার বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাঁড়িয়াল ইউনিয়নের কামারখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি দুই শিক্ষার্থীর ওপর গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এক শিক্ষক শিক্ষার্থীর দাঁত ভেঙে ফেলেছেন, আর অন্য শিক্ষক মারধরে আরেক শিশুর মেরুদণ্ডে আঘাত করে শারীরিক ক্ষতি করেছেন। ফলে স্কুলটি নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশের বদলে ভয় ও আতঙ্কের স্থান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
অভিভাবক, শিক্ষা ও শিশু অধিকার সংক্রান্ত গোষ্ঠীর সদস্যরা জানাচ্ছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা নিষিদ্ধ শাস্তি সংক্রান্ত পরিপত্রের বাস্তবায়ন যথেষ্ট কমে গেছে। তদুপরি, নির্যাতনের ঘটনাগুলোর পর্যবেক্ষণ ও তদারকি যথাযথভাবে না হওয়ায় শিশুরা সুরক্ষাহীন অবস্থায় রয়ে যায়। এ ধরনের অবহেলা শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
গত বছরও একই বিদ্যালয়ে একটি ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে দুষ্টুমি করার জন্য শিক্ষক বেত ব্যবহার করে মারধর করে আহত করেন। এই ঘটনা এবং সাম্প্রতিক দু’টি নির্যাতনের অভিযোগ একত্রে দেখায় যে, নিষিদ্ধ শাস্তির নীতি সত্ত্বেও কিছু শিক্ষকেরা তা অবহেলা করে চলেছেন।
শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফলও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালের মে মাসে বেসরকারি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস) একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে, যেখানে ৮৮ শতাংশ শিশুই কমপক্ষে একবার শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ শিশুরা একাধিকবার নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছে। পরিবারে ৫৮ শতাংশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৬ শতাংশ এবং খেলার মাঠে ৬৫ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
ঢাকার মিরপুরে ২০১৯ সালে করা আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, নিম্নবিত্ত পরিবারের ১০ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৪০১ শিশুর মধ্যে ১০ বছর বয়সের আগেই অধিকাংশের প্রথম নির্যাতনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। নির্যাতনের প্রধান দায়ী হিসেবে পরিবারিক সদস্যদের দায়িত্ব ৩৯ শতাংশে সর্বোচ্চ, তারপরে শিক্ষক (১৭ শতাংশ), অপরিচিত ব্যক্তি (১৫ শতাংশ), বন্ধু (১৩ শতাংশ), প্রতিবেশী (৫ শতাংশ) এবং অন্যান্য (১১ শতাংশ) রয়েছে। এই তথ্যগুলো দেখায় যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতন শুধুমাত্র শিক্ষক নয়, বহিরাগত কারণেও হতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে স্পষ্টভাবে কিছু শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে হাত-পা বা কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত, বেত ব্যবহার, চক বা ডাস্টার ছুঁড়ে মারা, আছাড় ও চিমটি কাটা, কামড়ানো, চুল টানা বা কাটা, এবং আঙুলের ফাঁকে আঘাত করা অন্তর্ভুক্ত। তবে বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞা সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে না বলে অভিভাবক ও শিশু অধিকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
অভিভাবকগণ উল্লেখ করছেন, নির্যাতনের ঘটনা তুচ্ছ করে উপেক্ষা করা হলে শিশুরা সুরক্ষাহীন থাকে এবং তাদের শিক্ষার মান হ্রাস পায়। তারা দাবি করছেন যে, মন্ত্রণালয়ের নীতি বাস্তবায়নের জন্য তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নির্যাতনের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা দরকার।
শিক্ষা সংস্থাগুলোর জন্য জরুরি সুপারিশ হিসেবে, বিদ্যালয়ে নির্যাতন রোধে একটি স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে এবং নিয়মিতভাবে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নীতি অনুসরণ যাচাই করবে। এছাড়া, শিক্ষক প্রশিক্ষণে শারীরিক শাস্তি বাদে বিকল্প শৃঙ্খলা পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো শিশুর ওপর নির্যাতনের সন্দেহ হয়, তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতি সঠিকভাবে কার্যকর না হলে, শিশুরা শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হতে পারে, যা তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে বাধা সৃষ্টি করে। তাই, নীতি বাস্তবায়ন, তদারকি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা একত্রে কাজ করলে শিক্ষার পরিবেশকে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব।
আপনার সন্তান যদি কোনো নির্যাতনের শিকার হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয় ও স্থানীয় শিশু অধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিন। নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের সবার দায়িত্ব।



