কানাডার আর্টিক অঞ্চল, প্রায় চার মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার বিশাল, কিন্তু জনসংখ্যা মাত্র কয়েক দশ হাজার, যা ইংল্যান্ডের ব্ল্যাকবার্ন বা নিউ ইয়র্কের সিরাকিউজের সমান। এই বিশাল ভূমি, উত্তর মেরুতে রাশিয়া সরকার ও মার্কিন সরকার দুজনের সীমানা ঘিরে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে।
আঞ্চলিক মানচিত্রে ইউরোপের কন্টিনেন্টাল অংশকে আর্টিকের ওপর রাখলেও যথেষ্ট জায়গা থাকে, যা অঞ্চলটির বিশালতা ও কঠিন পরিবেশকে তুলে ধরে। তীব্র শীত, হিমবাহ ও অপ্রবেশ্য ভূখণ্ডের কারণে এখানে মানব বসতি গড়া কঠিন, এবং সামরিক কার্যক্রমের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি প্রয়োজন।
কানাডা বর্তমানে পুরনো প্রারম্ভিক সতর্কতা রাডার, আটটি কর্মরত সামরিক ঘাঁটি এবং প্রায় একশো পূর্ণকালীন কোস্ট গার্ড কর্মী দ্বারা ১,৬২,০০০ কিলোমিটার উপকূল রক্ষা করে, যা দেশের মোট সমুদ্রতটের প্রায় ষাট শতাংশ গঠন করে। এই অবকাঠামো আর্টিকের বিস্তৃত জলে নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল ভিত্তি।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা তীব্র, রাশিয়া সরকার ও মার্কিন সরকার উভয়ই উত্তর মেরুর কৌশলগত গুরুত্ব স্বীকার করে, আর চীন সরকার “নিকট আর্টিক রাষ্ট্র” হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে নৌবাহিনীর জাহাজ ও আইসব্রেকার সংখ্যা বাড়াচ্ছে। ফলে কানাডা, যার জনসংখ্যা এই দুই বড় শক্তির তুলনায় নগণ্য, নিজেকে বড় ভূ-রাজনৈতিক চাপের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে।
রাশিয়া সরকারের ইউক্রেন আক্রমণের পর চার বছর কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্টিক নিরাপত্তা পুনরায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের ওপর মন্তব্য, যা ডেনমার্কের স্ব-শাসিত অংশ, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করা হয়, কানাডার উত্তরাঞ্চলকে পুনরায় আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে নিয়ে আসে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অবস্থান মার্কিন সরকারের আর্টিকের সম্ভাব্য দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। এপ্রিলে মার্কিন সরকার একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে, যেখানে আর্টিক জলের স্বাধীন নেভিগেশন ও মার্কিন আধিপত্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের আর্টিক নীতি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
কানাডা সরকার এই উদ্বেগের প্রতি সাড়া দিয়ে, মার্কিন সরকার ও ন্যাটোকে আশ্বস্ত করেছে যে দেশটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরাম, দাভোসে উপস্থিত হয়ে দেশটির আর্টিক রক্ষা করার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, কানাডা আর্টিকের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, রাডার নেটওয়ার্ক আপডেট এবং সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া, ন্যাটো ও মার্কিন সরকারের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ ও তথ্য শেয়ারিংকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, আর্টিকের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে নতুন নৌপথ উন্মোচিত হচ্ছে, যা বাণিজ্যিক ও সামরিক উভয় দিকেই আকর্ষণ বাড়াচ্ছে। ফলে কানাডা, রাশিয়া সরকার ও মার্কিন সরকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়, তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা উভয়ই প্রয়োজন।
আসন্ন বছরগুলোতে কানাডা আর্টিকের রাডার সিস্টেমের আধুনিকায়ন, নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং কোস্ট গার্ডের কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এই উদ্যোগগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা কানাডার আর্টিক নিরাপত্তা নীতি শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে দেখছেন।
সারসংক্ষেপে, কানাডা আর্টিকের বিশাল ও কঠিন ভূখণ্ডে সীমিত জনসংখ্যা সত্ত্বেও, রাশিয়া সরকার, মার্কিন সরকার এবং চীন সরকারের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের মুখে তার নিরাপত্তা কৌশল পুনর্গঠন করছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সামরিক আধুনিকায়ন এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এই অঞ্চলে কানাডার স্বার্থ রক্ষার মূল চাবিকাঠি হবে।



