ইস্রা নামের এক তরুণী শরণার্থীর দশ বছরের জীবনচিত্র ‘ওয়ান ইন এ মিলিয়ন’ ডকুমেন্টারিতে তুলে ধরা হয়েছে। ইস্রা প্রথম দেখা যায় ২০১৫ সালে, যখন তার বয়স মাত্র এগারো বছর এবং সে তুর্কির ইজমির ব্যস্ত বাজারে তার পিতার সঙ্গে সিগারেট ও গ্যাজেট বিক্রি করছিল। ছবিটি ইটাব আজ়াম এবং জ্যাক ম্যাকইনেসের পরিচালনায়, এবং সান্ডান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বিশ্ব সিনেমা ডকুমেন্টারি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে।
ইটাব আজ়াম ও জ্যাক ম্যাকইনেস দুজনই সিরিয়ার নাগরিক, যাঁরা ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধের সূচনা হওয়ার পর দেশ ত্যাগ করেন। যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ থেকে পালিয়ে তারা ইউরোপে নতুন জীবন গড়ার পথে ছিলেন, এবং শরণার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ধারণ করার ইচ্ছা তাদেরকে ইজমির বাজারে ইস্রার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
ইস্রা তখনই তার পিতার তরিকের সঙ্গে সিগারেট ও ছোট ইলেকট্রনিক সামগ্রী বিক্রি করে পরিবারের জীবিকা চালাচ্ছিল। বাজারের গুঞ্জন, গাড়ির হর্নের শব্দ এবং বিক্রয়ের তাগিদে ভরা সন্ধ্যাগুলোই ছিল তার শৈশবের প্রাথমিক দৃশ্য। তরিক ও ইস্রা এই কাজের মাধ্যমে ইউরোপে গোপন পথে যাত্রা করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন।
পরিবারের লক্ষ্য ছিল জার্মানিতে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা, তাই তারা মানব পাচারকারীর নৌকায় চড়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বহুবার বিলম্বিত হয়, এবং শরণার্থীদের জীবনে অনিশ্চয়তা ও ভয় সর্বদা উপস্থিত থাকে। ডকুমেন্টারিতে এই অনিশ্চয়তার মুহূর্তগুলোকে সূক্ষ্মভাবে ধরা হয়েছে, যেখানে ইস্রা ও তার পরিবার বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হয়।
পরিচালকরা ইস্রার সঙ্গে দশ বছর ধরে ক্যামেরা চালিয়ে গেছেন, তার শৈশব থেকে কিশোরবয়স, এবং অবশেষে তরুণী বয়স পর্যন্ত। এই সময়কালে ইস্রা কেবল শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবে ও সামাজিকভাবে বড় হয়েছে। তার জীবনের গতি, বন্ধুত্ব, প্রেম, এবং পরিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তনগুলো ডকুমেন্টারির মূল কাঠামো গঠন করে।
ডকুমেন্টারির কেন্দ্রীয় থিমগুলো হল যুদ্ধের পরিণতি, শরণার্থীর জীবনে বহন করা একাকিত্ব, এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জটিলতা। ইস্রা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের শিকার, তুর্কিতে অস্থায়ী আশ্রয়, এবং জার্মানিতে নতুন পরিচয়ের সন্ধানে নিজেকে খুঁজে পায়। তার পরিচয় একদিকে তার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়াসে রূপান্তরিত হয়।
ইস্রার কিশোরবয়সের অভিজ্ঞতা, যেমন স্কুলে নতুন ভাষা শিখা, সহপাঠীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়া, এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা, ডকুমেন্টারিতে আন্তরিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তার গল্পের মাধ্যমে শরণার্থীদের জীবনে স্বাভাবিক শৈশবের আনন্দ ও কষ্টের সমন্বয় প্রকাশ পায়।
সান্ডান্স ফেস্টিভ্যালে এই চলচ্চিত্রটি ১ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের দৈর্ঘ্যে উপস্থাপিত হয় এবং বিশ্ব সিনেমা ডকুমেন্টারি প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দর্শক ও সমালোচকরা ছবির গভীর আবেগ, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ এবং ইস্রার ব্যক্তিগত আকর্ষণকে প্রশংসা করেন। চলচ্চিত্রটি শরণার্থীর মানবিক দিককে উন্মোচন করে, যা দর্শকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
ডকুমেন্টারির নির্মাণ প্রক্রিয়ায় পরিচালকদের নিজস্ব শরণার্থী অভিজ্ঞতা কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, ফলে ছবিতে বাস্তবিকতা ও সহানুভূতির মিশ্রণ দেখা যায়। ইস্রার সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক, তার জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ক্যামেরা উপস্থিতি, চলচ্চিত্রকে একধরনের ব্যক্তিগত ডায়েরি রূপে উপস্থাপন করে।
‘ওয়ান ইন এ মিলিয়ন’ শরণার্থীর জীবনের জটিলতা ও মানবিক দিককে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে, যা শুধুমাত্র একটি ব্যক্তির গল্প নয়, বরং বিশ্বব্যাপী শরণার্থীর সংগ্রামের প্রতিফলন। এই চলচ্চিত্রটি দর্শকদেরকে শরণার্থীর বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করে, এবং মানবিক সহানুভূতির ভিত্তিতে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।
সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পরিবর্তন, যুদ্ধের পরিণতি, এবং নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ—এই সব বিষয় একত্রে ‘ওয়ান ইন এ মিলিয়ন’ ডকুমেন্টারিতে সংযুক্ত হয়েছে, যা বিনোদন ও তথ্যের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কাজ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।



