মিয়ানমার জাঁতা সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক বিমান হামলায় এক বিয়ের অনুষ্ঠান ও একটি দোয়া মাহফিলকে লক্ষ্য করে অন্তত ২৭ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। ঘটনাগুলি ঘটেছে মায়ানমারের কেন্দ্রীয় ও রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে, যেখানে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ বহু মানুষ আহত হয়েছে। এই আক্রমণগুলো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে তীব্র নিন্দা ও মানবিক উদ্বেগের সাড়া পেয়েছে।
ম্যাগওয়ে অঞ্চলের আউংলান টাউনশিপের তাট কোনে গ্রামে একটি বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল, যখন জান্তা বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। বোমা বিস্ফোরণের ফলে এক শিশুসহ কমপক্ষে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আশেপাশের বাড়ি-গৃহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় তথ্য সংস্থা আউংলান ইনফরমেশন গ্রুপের মতে, আহতদের মধ্যে গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক মানুষও অন্তর্ভুক্ত।
একই দিনে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকতাও ও পন্নাগিউন টাউনশিপের সীমান্তে আরাকান আর্মি (এএ) পরিচালিত একটি কারাগারে আরেকটি বিমান হামলা চালানো হয়। এই আক্রমণে ২১ জন জান্তা সৈনিক ও তাদের আত্মীয়-স্বজন নিহত এবং প্রায় ৩০ জন আহত হয়েছে। কারাগারের ভিতরে থাকা বন্দিদের ওপর সরাসরি আক্রমণ হওয়ায় মানবাধিকার সংস্থাগুলি এটিকে যুদ্ধবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কিয়ান আর্মি (কেআইএ) এর মুখপাত্র কর্নেল নাও বু উল্লেখ করেন, ওই গ্রামে কেআইএর কোনো উপস্থিতি বা সদস্য ছিল না এবং জান্তা বাহিনী জেনেশুনেই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তিনি বলেন, “তারা শত্রু ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না; স্কুল, বাজার ও ধর্মীয় সমাবেশে বোমা ফেলছে।” এই মন্তব্যটি জান্তা বাহিনীর সামরিক কৌশলকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোও এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের সর্বজনীন নিরাপত্তা পরিষদে মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়ে একটি জরুরি সমাধান প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া, আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানও মিয়ানমার সংকট সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জান্তা বাহিনীর বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু আক্রমণকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে, এবং অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিও একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করে, মিয়ানমার সরকারকে তৎক্ষণাৎ সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ করতে এবং মানবিক সহায়তা প্রবাহ নিশ্চিত করতে আহ্বান জানিয়েছে।
এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও চীন, যাদের সীমান্তে শরণার্থী প্রবাহের সম্ভাবনা বাড়ছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমার সংবেদনশীলতা বজায় রেখে, সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রীও মানবিক সহায়তা প্রদান এবং শরণার্থীদের নিরাপদ রফতারের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু আক্রমণগুলো জান্তা বাহিনীর কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে, যেখানে তারা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়াতে সাধারণ জনগণকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিক সমর্থন হারানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে এবং মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলবে।
অবিলম্বে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় দপ্তর (OCHA) রাহদারী দল গঠন করেছে এবং সীমান্ত পারাপারের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করার পরিকল্পনা চালু করেছে। তবে, চলমান বোমা হামলা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
আসিয়ানের শীর্ষ পর্যায়ে এখনো কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি, তবে সদস্য দেশগুলোকে একত্রে কাজ করে শান্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে, মিয়ানমার জাতীয় সংলাপের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল গঠন এবং জান্তা বাহিনীর মানবিক আইনের লঙ্ঘন বন্ধ করার জন্য চাপ বাড়ানো জরুরি বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, জান্তা বাহিনীর সাম্প্রতিক বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু আক্রমণগুলো মিয়ানমারের ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মানবিক অবস্থা আরও খারাপ করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। ভবিষ্যতে শান্তি আলোচনার সাফল্য নির্ভর করবে এই ধরনের আক্রমণ বন্ধ করা এবং মানবিক সহায়তা প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর।



