২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি, বিস্তৃত সামরিক ও নাগরিক কর্মী, এবং বহু দেশের অংশগ্রহণের ফলে গড়ে ওঠা এক জটিল নিরাপত্তা দৃশ্যপটের সারমর্ম এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সময়কালে সশস্ত্র সংঘাত, সন্ত্রাসী শিকারের অভিযান এবং শেষ পর্যন্ত বৃহৎ পরিসরের প্রত্যাহার ঘটেছে।
প্রথমে, সৈন্যবাহিনীর গন্তব্যস্থল ছিল কন্দাহার, কাবুল এবং ক্যাম্প বাস্টিয়ন। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের জেটের অন্ধকারে ধীর অবতরণ অথবা সি‑১৩০ ট্রান্সপোর্টের দ্রুত ঘূর্ণায়মান অবতরণ, উভয়ই তালেবান কর্তৃক পরিচালিত পৃষ্ঠ-থেকে-আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি এড়ানোর জন্য করা হতো। বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর ছিল, এবং অবতরণের পর সৈন্যদের জন্য প্রথম কাজ ছিল নিরাপদে ভিত্তি স্থাপন করা।
বেসে পৌঁছানোর পর সৈন্যদের মুখোমুখি হতে হতো বিস্ফোরক প্রাচীর, রকেট আক্রমণ, ফরোয়ার্ড অপারেটিং বেস (FOB) এবং আত্মঘাতী বোমা (IED) দ্বারা সৃষ্ট হুমকি। ক্যাফেটের দীর্ঘ সারি, সীমিত খাবারের সরবরাহ এবং শীতল রাতের শিফটে কাজ করা, সবই দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। এই কঠিন পরিবেশে সেবা করা প্রত্যেকেরই নিজস্ব স্মৃতি রয়ে গিয়েছে।
দুই দশকের মধ্যে হাজার হাজার সৈন্য ও নারীর পাশাপাশি সশস্ত্র নয় এমন কর্মী, দু’শো অধিক দেশের প্রতিনিধিত্বকারী, আফগানিস্তানে মোতায়েন হয়। তাদের কাজের পরিসর ছিল লজিস্টিক্স, প্রশিক্ষণ, পুনর্গঠন এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ। এই বহুমুখী উপস্থিতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই মোতায়েনের আইনি ভিত্তি ছিল ন্যাটোর আর্টিকেল ৫, যা ন্যাটোর ৭৭ বছরের ইতিহাসে একমাত্রবার সক্রিয় করা হয়। আর্টিকেল ৫ অনুসারে, কোনো সদস্যের উপর আক্রমণ হলে তা সকল সদস্যের উপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয়, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান আন্তর্জাতিক সমর্থন পায়।
সেই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিল ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এ যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা, যেখানে প্রায় ৩,০০০ মানুষ নিহত হয়। আল-কায়দা, যা তালেবান আফগানিস্তানে আশ্রয় দিচ্ছিল, এই হামলার পেছনের দায়ী হিসেবে চিহ্নিত হয়।
সেই পরেই যুক্তরাষ্ট্র, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এবং আফগানিস্তানের নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের যৌথ অভিযান তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। এই সামরিক অভিযান, যা কয়েক মাসের মধ্যে তালেবানের শাসন কাঠামোকে দুর্বল করে, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন আনে।
তালেবানকে সরিয়ে ফেলার পর, আন্তর্জাতিক বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে আল-কায়দার অবশিষ্ট শক্তি ধ্বংস করা। ব্রিটিশ রয়্যাল মেরিনস এবং যুক্তরাজ্যের স্পেশাল ফোর্সেস পাহাড়ি অঞ্চলে শিকারের অভিযান চালায়, তবে অনেক সন্ত্রাসী পাকিস্তানে পলায়ন করে পুনর্গঠন করে। এই পলায়ন, পরবর্তী দশকে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের পুনরুত্থানে ভূমিকা রাখে।
দশ বছর পর, ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সিল টিম সিক্সের কমান্ডো অব্যাবতাবাদ, পাকিস্তানের একটি ভিলায় ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে। এই অপারেশন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং আল-কায়দার নেতৃত্বের অবসানকে চিহ্নিত করে।
প্রারম্ভিক দুই বছর, অর্থাৎ “অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম” নামে পরিচিত সময়কাল, তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। তবে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ইরাকের দিকে সরে যাওয়ায়, আফগানিস্তানের যুদ্ধকে কখনও কখনও “অপ ফর্গটেন” বলে অভিহিত করা হয়। তবু বেসে রকেট, সি-আই-ইডি এবং শত্রু আক্রমণের ঝুঁকি অব্যাহত থাকে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “আফগানিস্তানের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি কেবল সন্ত্রাসী শিকারের জন্য নয়, বরং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে”। রোমানিয়ার সৈন্যবাহিনী, তুর্কি ও অস্ট্রিয়ান ইউনিটসহ বিভিন্ন দেশের টুকরো টুকরো দল, বেসের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ মিশনে অংশ নেয়।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রধান বাহিনীর প্রত্যাহার শেষ হয়, যা আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা করে। তালেবান পুনরায় শাসন গ্রহণের পর, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মানবিক সহায়তা, শরণার্থী সংকট এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হয়। ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল থাকবে।



