যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২২ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সময় ন্যাটো জোটের সঙ্গতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সংকটের মুহূর্তে মিত্র দেশগুলো কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকবে, তা এখনো চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে রয়ে গেছে। এই মন্তব্যের পেছনে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ন্যাটো‑মিত্রদের ভূমিকা হ্রাসের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, যা তিনি সাম্প্রতিক সময়ে ডেনমার্কের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনা বাড়ানোর পরেও পুনর্ব্যক্ত করেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল ছিল না এবং ভবিষ্যতেও তা পরিবর্তিত হবে না। তিনি যুক্তি দেন, আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় ন্যাটো দেশগুলো সামনের সারিতে না থেকে পেছনের দিকে অবস্থান করেছিল, ফলে তাদের অবদানকে তিনি কমিয়ে দেখিয়েছেন। এই রকম মন্তব্য ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নতুন রকমের রাগের সঞ্চার ঘটায়, বিশেষ করে ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে, যাদের সঙ্গে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি সম্পর্কিত উত্তেজনা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।
১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো ন্যাটোর ধারা ৫ কার্যকর করে, যা জোটের কোনো সদস্যের ওপর আক্রমণকে সকল সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করে। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো ও তার অংশীদার দেশগুলো আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালায়। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর পাশাপাশি ব্রিটেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, কানাডা এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সৈন্যরা মিশনে অংশ নেয়। ট্রাম্পের মতে, যদিও এই দেশগুলো সেনা পাঠিয়েছে, তবে তারা যুদ্ধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলোতে না থেকে পেছনের দিকে কাজ করেছে।
আফগানিস্তান মিশনে ন্যাটো‑মিত্র দেশগুলোর মোট প্রায় ৩,৫০০ সৈন্যের মৃত্যু রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ২,৪৫৬ সৈন্য, ব্রিটেনের ৪৫৭ সৈন্য এবং ডেনমার্কের ৪০‑এর বেশি সৈন্যের মৃত্যু অন্তর্ভুক্ত। ডেনমার্কের জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ মিলিয়ন, তবু ৪০ টির বেশি সৈন্যের ক্ষতি দেশটির জন্য অনুপাতগতভাবে বড় ত্যাগ হিসেবে বিবেচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মোট ক্ষতি প্রায় ২,৪৫৬ সৈন্যের সমান, যা ন্যাটো‑মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবদানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে দাভোসে সরাসরি দেন। রুটে জোর দিয়ে বলেন, ন্যাটো একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা কোনো একক দেশের স্বার্থে নয়, বরং সমষ্টিগত নিরাপত্তার জন্য গড়ে উঠেছে। তিনি ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ন্যাটো সদস্য দেশগুলো সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা বজায় থাকবে। রুটের এই বক্তব্য ন্যাটোর অভ্যন্তরে ট্রাম্পের মন্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করার একটি স্পষ্ট সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের এই রেকর্ডের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র‑ন্যাটো সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ন্যাটো‑সদস্য দেশগুলোর প্রতি অবিশ্বাসের প্রবণতা বাড়লে, জোটের সামগ্রিক কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে ন্যাটোকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, আর ট্রাম্পের মতামত এই ঐক্যকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। অন্যদিকে, ন্যাটো দেশগুলো ট্রাম্পের মন্তব্যকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের সমন্বয় বজায় রাখার প্রচেষ্টা চালাবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
এই বিতর্কের মধ্যে ন্যাটো‑মিত্র দেশগুলো ইতিমধ্যে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে জোটের অভ্যন্তরীণ সংহতি শক্তিশালী হয়। দাভোসে অনুষ্ঠিত ফোরামটি ন্যাটো‑মিত্রদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তারা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যৌথ কৌশল নির্ধারণের চেষ্টা করবে। ট্রাম্পের মন্তব্য যদিও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, তবু ন্যাটো জোটের মৌলিক নীতি এবং ঐতিহাসিক সহযোগিতা এখনও অটুট রয়ে গেছে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের ন্যাটো‑মিত্রদের প্রতি সন্দেহজনক মন্তব্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রের একটি সংবেদনশীল বিষয় উন্মোচিত করেছে। ন্যাটোর নেতৃত্ব এই চ্যালেঞ্জের মুখে জোটের ঐক্য ও পারস্পরিক সমর্থনকে পুনর্ব্যক্ত করার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্র দেশগুলো সত্যিকারের পাশে দাঁড়াতে পারে।



