আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার আধিপত্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড যুক্ত করার সাম্প্রতিক দাবি আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকান ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে একটি নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন। এই দাবি ডেনমার্কের অধীনে থাকা গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, ফলে যুক্তরাষ্ট্র‑ডেনমার্ক সম্পর্কের পাশাপাশি আর্কটিকের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর বিশ্বজুড়ে বিস্ময় ও সমালোচনা দেখা গিয়েছে, কারণ গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক ও আইনি অবস্থান স্পষ্টভাবে ডেনমার্কের অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আর্কটিকের সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
আর্কটিকের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা কয়েক দশক ধরে তীব্রতর হয়ে আসছে, তবে রাশিয়া দীর্ঘদিন থেকে এই অঞ্চলে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। শীতল যুদ্ধের পরেও রাশিয়া আর্কটিকের ভূখণ্ড, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অংশ ধরে রেখেছে।
ভূগোলিক দিক থেকে রাশিয়া আর্কটিকের উত্তরাংশের প্রায় অর্ধেক ভূমি ও সমুদ্রসীমা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর্কটিকের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ রাশিয়ার অধিবাসী, যা অঞ্চলটির জনমিতিক গঠনকে রাশিয়ার হাতে কেন্দ্রীভূত করে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আর্কটিক বিশ্ব অর্থনীতির মাত্র ০.৪% অংশ গঠন করলেও, রাশিয়া সেখানে উৎপাদিত দুই-তৃতীয়াংশ অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে। এই পরিসংখ্যান রাশিয়ার আর্কটিকের সম্পদ ও শিল্পের ওপর প্রভাবকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
সামরিক ক্ষেত্রে রাশিয়া গত কয়েক দশকে আর্কটিককে শক্তিশালী করেছে। সিমন্স ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, আর্কটিক অঞ্চলে মোট ৬৬টি বড় সামরিক ঘাঁটি ও শত শত প্রতিরক্ষা স্থাপন রয়েছে। এদের মধ্যে রাশিয়া ৩০টি, ন্যাটো সদস্য দেশগুলো ৩৬টি, নরওয়ে ১৫টি (একটি ব্রিটিশ ঘাঁটি সহ), যুক্তরাষ্ট্র ৮টি, কানাডা ৯টি, গ্রিনল্যান্ডে ৩টি এবং আইসল্যান্ডে ১টি।
যদিও ঘাঁটির সংখ্যা রাশিয়ার বেশি, তবে সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে রাশিয়া ন্যাটোর সঙ্গে সমান স্তরে নেই। ন্যাটো দেশগুলো আধুনিক সরঞ্জাম ও সমন্বিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আর্কটিকের নিরাপত্তা বজায় রাখে, যেখানে রাশিয়ার ঘাঁটি অধিকাংশই কৌশলগতভাবে বিচ্ছিন্ন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া পারমাণবিক সাবমেরিন ফ্লিটের আধুনিকীকরণে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি ইউক্রেনের সংঘাতে রাডার, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নত করার জন্যও উল্লেখযোগ্য সম্পদ ব্যয় করা হয়েছে। এই উন্নয়নগুলো আর্কটিকের সামরিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শীতল যুদ্ধের পর এক সময় আর্কটিকের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংক্রান্ত সহযোগিতা সম্ভাব্য ছিল। ১৯৯৬ সালে গঠিত আর্কটিক কাউন্সিল রাশিয়া ও অন্যান্য সাতটি আর্কটিক দেশের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ও আদিবাসী অধিকার রক্ষার জন্য সংলাপের মঞ্চ তৈরি করেছিল। নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনাতেও রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
তবে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়ার অবৈধ সংযুক্তি এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণ পরিসরের আক্রমণ এই সহযোগিতাকে ভেঙে দিয়েছে। উভয় ঘটনার পর আর্কটিক কাউন্সিলের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায় এবং রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে আস্থা হ্রাস পায়।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটো যোগদানের ফলে আর্কটিক কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এক পাশে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল, অন্য পাশে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল। এই বিভাজন আর্কটিকের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে গঠন করছে।
ভবিষ্যতে আর্কটিকের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দাবি এবং ন্যাটো সম্প্রসারণের ফলে আর্কটিকের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠন হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এই পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করা এবং সম্ভাব্য সংঘাতের প্রতিরোধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানো জরুরি।



