বহু মহাবিশ্বের ধারণা বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ে আলোচনার বিষয়, যেখানে বিভিন্ন তত্ত্বের মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্বের বাইরে সম্ভাব্য অন্য বাস্তবতার অস্তিত্ব অনুসন্ধান করা হয়। এই বিষয়টি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতে বহু মহাবিশ্বের থিম প্রায়ই দেখা যায়; তবে বাস্তব বিজ্ঞানীরা এই ধারণাকে কেবল কল্পনা নয়, বরং মহাবিশ্বের মৌলিক প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর হিসেবে বিবেচনা করেন। বিশেষ করে কসমোলজি ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু মূল তত্ত্বে এই বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্থান পায়।
কসমোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে, মহাবিস্ফোরণের পরপরই একটি দ্রুত বিস্তার পর্যায় ঘটেছিল, যা ‘ইনফ্লেশন’ নামে পরিচিত। এই সময়ে মহাবিশ্বের গঠনগত ক্ষুদ্র কণিকাগুলোর কোয়ান্টাম অস্থিরতা বিশাল মাত্রায় প্রসারিত হয়, ফলে স্থানিক ঘনত্বে সূক্ষ্ম পার্থক্য সৃষ্টি হয়।
এই ঘনত্বের পার্থক্যই গ্যালাক্সি, নক্ষত্র ও গ্রহের গঠনকে প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করে। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের সীমার মধ্যে এই অস্থিরতা থেকে উদ্ভূত ঘনত্বের বৈচিত্র্যই আজকের মহাজাগতিক গঠনকে ব্যাখ্যা করে।
তবে ইনফ্লেশনের প্রভাব পর্যবেক্ষণযোগ্য সীমার বাইরে কী রকম হতে পারে, তা এখনও গবেষণার বিষয়। তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের অনন্ত বিস্তারের সময় কোয়ান্টাম অস্থিরতা এমন অঞ্চল তৈরি করতে পারে, যেখানে মৌলিক কণার ভর ও বলের শক্তি আমাদের মহাবিশ্বের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, এমন একটি অঞ্চল যেখানে ইলেকট্রনের ভর আমাদের পরিচিত মানের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে, অথবা মহাকর্ষের শক্তি ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে। এই ধরনের ভিন্নতাগুলো জীবনের অস্তিত্বের জন্য অনুকূল নাও হতে পারে, ফলে সেই জায়গায় কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া গঠিত হওয়া কঠিন হতে পারে।
ইনফ্লেশন তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, যদিও আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে এই দ্রুত বিস্তার শেষ হয়েছে, তবুও অন্য কোনো অঞ্চলে এটি অনন্তকাল ধরে চলতে পারে। অর্থাৎ, আমাদের মহাবিশ্বের বাইরে অবিচ্ছিন্নভাবে নতুন নতুন ‘বাবল’ গঠন হতে পারে, যেগুলো প্রত্যেকটি নিজস্ব শারীরিক নিয়ম নিয়ে গঠিত।
এই ধারণা থেকে বোঝা যায় যে, আমাদের মহাবিশ্ব কেবল একটিমাত্র ‘বাবল’ নয়, বরং বিশাল সমাবেশের একটি অংশ হতে পারে, যেখানে প্রত্যেকটি বাবল আলাদা শারীরিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। যদিও এই তত্ত্বগুলো এখনো পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণের অভাবে রয়েছে, তবুও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও গাণিতিক মডেলগুলো এই সম্ভাবনাকে সমর্থন করে।
বহু মহাবিশ্বের তত্ত্বের বর্তমান অবস্থান হল, এটি এখনও বৈজ্ঞানিক অনুমান পর্যায়ে রয়েছে এবং সরাসরি পরীক্ষামূলক যাচাইয়ের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি এখনো বিকাশিত হয়নি। তবে কসমোলজিক্যাল ডেটা, যেমন কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন ও গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের বণ্টন, এই তত্ত্বের কিছু দিককে পরোক্ষভাবে সমর্থন করতে পারে।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ে এই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে; কেউ কেউ এটিকে মহাবিশ্বের গঠনগত রহস্যের সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখেন, আবার অন্যরা এটিকে অতিরিক্ত অনুমান হিসেবে বিবেচনা করেন। যেকোনো ক্ষেত্রে, বহু মহাবিশ্বের ধারণা আমাদের মহাবিশ্বের সীমা ও প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
পাঠকগণকে আহ্বান করা হচ্ছে, এই তত্ত্বের অগ্রগতি ও নতুন গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে আপডেটেড থাকতে এবং বৈজ্ঞানিক আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে। ভবিষ্যতে যদি কোনো পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ এই ধারণাকে সমর্থন করে, তবে তা আমাদের মহাবিশ্বের ধারণাকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা দিতে পারে।



