পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৩ জানুয়ারি কলকাতার রেড রোডে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন, নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য চলমান বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার চাপের ফলে রাজ্যে প্রতিদিন তিন থেকে চারজন মানুষ আত্মহত্যা করছেন। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ার কারণে ১১০েরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগী হাসপাতালে জীবনের জন্য লড়াই করছেন।
মমতা বলেন, ভোটার তালিকার সংশোধন কাজের ফলে নাগরিকত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার ফলে মানসিক চাপের শিকার হওয়া মানুষদের মৃত্যুর দায়ভার ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন শাসনকে দেওয়া উচিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি স্বাধীনতা সংগ্রামী সুবাসচন্দ্র বোস আজও জীবিত থাকতেন, তবে তিনি কি এসআইআর শুনানির মুখোমুখি হতেন এবং তার ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠত?
এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপের পর, গত বছরের ডিসেম্বর প্রকাশিত খসড়া তালিকায় ৫৮ লক্ষেরও বেশি ভোটার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। মোট প্রায় ৭.৬ কোটি ভোটার তালিকায় থাকা সত্ত্বেও, নির্বাচন কমিশন প্রায় ১.৬৬ কোটি ভোটারকে নথি যাচাই ও শুনানির জন্য ডাকা হয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ওপর প্রক্রিয়ার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মমতা উল্লেখ করেন, বাংলার মানুষ নামের বানানে পার্থক্য থাকলেও একই পরিবারে থাকা ব্যক্তিদের নাম ভিন্নভাবে লেখা হয়; উদাহরণস্বরূপ, বানার্জি ও বন্দ্যোপাধ্যায় উভয় নামেই বানান ভিন্ন হতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের অসঙ্গতি সত্ত্বেও ১.৩৮ কোটি মানুষকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এছাড়া, বয়স্ক নাগরিকদেরও এসআইআর শুনানিতে হাজির হতে বাধ্য করা হয়েছে, যা তিনি অযৌক্তিক বলে সমালোচনা করেন।
মমতা প্রশ্ন তোলেন, কেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের নামেও নোটিশ পাঠানো হয়েছে, যদিও তিনি নাগরিকত্বের প্রশ্নের বাইরে। তিনি এটিকে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের একটি উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
বিজেপি-কে লক্ষ্য করে মমতা গেরুয়া দলকে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বলেন, মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষ চন্দ্র বসু, বি. আর. আম্বেদকর এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো দেশের প্রতীকী ব্যক্তিত্বদের অপমান করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার ভারতের ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করছে এবং তা দেশের গৌরবকে ক্ষুন্ন করছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আইনি ভিত্তি বজায় রাখতে বলা হয়েছে যে, এসআইআর ভোটার তালিকাকে সঠিক ও আপডেটেড রাখতে অপরিহার্য। কমিশন জোর দেয়, সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্বিগুণ ভোটার রেকর্ড ও অপ্রয়োজনীয় নাম বাদ দেওয়া সম্ভব, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। তবে, এই ব্যাখ্যা মমতার বক্তব্যের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ, কারণ তিনি প্রক্রিয়ার মানবিক দিক ও মানসিক চাপের ওপর জোর দেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট সামাজিক উদ্বেগ ও আত্মহত্যার সংখ্যা রাজনৈতিক আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদি সত্যিই দৈনিক কয়েকজন আত্মহত্যা হয়, তবে তা নির্বাচন প্রক্রিয়ার ন্যায়বিচার ও মানবিক দিকের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
বঙ্গের রাজনৈতিক পরিবেশে এই বিষয়টি পরবর্তী সময়ে কীভাবে বিকশিত হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে এই সমস্যার সমাধানে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে, বিরোধী দলগুলোও প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতা ও প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, যা ভবিষ্যতে আদালতে বা সংসদে আলোচনার বিষয় হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, ভোটার তালিকার সংশোধন প্রক্রিয়া ও তার সামাজিক প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা রাজনৈতিক নেতাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি যথাযথ সমাধান না হয়, তবে আত্মহত্যা ও মানসিক চাপের সংখ্যা বাড়তে পারে, যা নির্বাচনের বৈধতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রশ্ন তুলবে।
সর্বশেষে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের ভিত্তিতে, নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার মানবিক দিককে গুরুত্ব দিয়ে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।



