ওয়াশিংটন ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার উত্তরভাগে কুর্দি-সমর্থিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) ধ্বংসের পর পুরো মার্কিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের কথা ভাবছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের মতে, সিরিয়ার বর্তমান সরকার যখন এসডিএফকে নাশ করার জন্য সামরিক অভিযান চালাবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র এই সিদ্ধান্ত নেবে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা গৃহযুদ্ধের সময় গঠিত বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে নিষ্ক্রিয় করে জাতীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তার লক্ষ্য হল দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বিদেশি বাহিনীর প্রভাব কমানো।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি এসডিএফ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়, তবে সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কোনো কৌশলগত কারণ থাকবে না। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সঙ্গে কথা বলা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, বর্তমান সিরিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা কঠিন, কারণ তাদের মধ্যে চরমপন্থী ও জিহাদি মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিরা রয়েছেন। এছাড়া, ঐ বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে কুর্দি ও দ্রুজ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগও রয়েছে।
তুরস্কের সমর্থনে ক্ষমতায় আসা শারার বাহিনী ও এসডিএফের মধ্যে চলমান সংঘর্ষের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মার্কিন সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ও মিশনের স্থায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে, এসডিএফের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বন্দি থাকা প্রায় সাত হাজার আইএস সদস্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে ইরাক সরকারের সন্ত্রাসী বন্দিদের নিরাপদে রাখার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। রুবিও স্পষ্ট করে বলেন, অ-ইরাকি বন্দিরা অস্থায়ীভাবে সেখানে থাকবে, এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে দ্রুত তাদের নাগরিকদের প্রত্যাবর্তনের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
পূর্বে সিরিয়ার উত্তরে মার্কিন উপস্থিতি প্রধানত এসডিএফের সঙ্গে সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা ইরাক ও সিরিয়ার সীমানা রক্ষা এবং আইএসের পুনরুত্থান রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল। তবে শারার সরকার যখন এই গোষ্ঠীকে নাশ করার লক্ষ্যে সামরিক অভিযান চালাবে, তখন মার্কিন কূটনৈতিক ও সামরিক নীতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়াবে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ব্রেট ম্যাকগার্ক পেন্টাগনের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি যুক্তি দেন, দ্রুত প্রত্যাহার করলে অঞ্চলে শূন্যস্থান তৈরি হতে পারে, যা চরমপন্থী গোষ্ঠীর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে, তবে সিরিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তিত হবে এবং তুর্কি-সিরিয়ান সমন্বয় শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে, রাশিয়া ও ইরানের প্রভাবও বাড়তে পারে, যা পশ্চিমা মিত্রদের জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
অবশ্যই, সিরিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহযোগিতা এখনো অসম্ভব বলে বিবেচিত হচ্ছে, তবে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা গ্যারান্টি ও সন্ত্রাসী মোকাবিলার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক দল সিরিয়ার সরকার ও আঞ্চলিক পার্টনারদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে, যাতে প্রত্যাহারের সময়সূচি ও শর্তাবলী নির্ধারিত হয়। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আইএস বন্দিদের পুনর্বাসন ও পুনরায় রেডিকালাইজেশন রোধে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
সারসংক্ষেপে, সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে এসডিএফের পরাজয়ের পর মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা, সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন, এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে একটি জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়া কেবল সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকেও প্রভাবিত করবে।



