ইয়েমেনের দক্ষিণে প্রাক্তন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে গোপন কারাগারের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা দেশের দশ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময় ইউএই ও তার মিত্রদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার অভিযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা বিবিসি এই ঘাঁটিগুলোতে প্রবেশের অনুমতি পেয়ে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছে এবং শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নির্যাতনের রিপোর্ট পেয়েছে।
ইয়েমেনের সরকার, যা সৌদি আরবের সমর্থনে হুথি বিদ্রোহীর বিরোধে ইউএইয়ের সঙ্গে মিত্র ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে দু’দেশের সম্পর্কের অবনতি দেখেছে। জানুয়ারি মাসের শুরুতে ইউএই বাহিনী দেশ ত্যাগ করে, ফলে সরকারী সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্রগণ দক্ষিণের বেশ কিছু অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেছে, যার মধ্যে মুকাল্লা বন্দরও অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবর্তনের পর, ইয়েমেনের তথ্য মন্ত্রী মোয়াম্মার আল-এরিয়ানি বিবিসিকে দু’টি ঘাঁটি দেখানোর জন্য আমন্ত্রণ জানায়।
বিবিসি দলটি মুকাল্লা বন্দর থেকে একটি সৌদি সামরিক বিমান দিয়ে গিয়ে আল-ধাবা তেল রপ্তানি অঞ্চলে অবস্থিত প্রাক্তন ইউএই ঘাঁটিগুলো পরিদর্শন করে। প্রথম ঘাঁটিতে প্রায় দশটি শিপিং কন্টেইনার দেখা যায়, যেগুলোর অভ্যন্তরীণ অংশ কালো রঙে রঙ করা এবং বায়ু চলাচল খুবই সীমিত। কন্টেইনারের বাইরের দিকের দেয়ালে নাম, তারিখ এবং বন্দি হওয়ার দিন সংখ্যা খোদাই করা ছিল, যার কিছু তারিখ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত রেকর্ড করা। এই চিহ্নগুলো বন্দিদের সময়কাল নির্ধারণের জন্য ব্যবহার করা হয় বলে ধারণা করা হয়।
দ্বিতীয় ঘাঁটিতে ইট ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি আটটি সেল দেখা যায়, যেগুলোতে বন্দিদের অবস্থান ও শর্তাবলী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যদিও ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি কোনো বন্দি উপস্থিত ছিল না, তবু পর্যবেক্ষকরা জানায় যে কন্টেইনার ও সেল দুটিই মানবিক মানদণ্ডের বাইরে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নীতিমালার লঙ্ঘন ঘটাতে পারে।
ইউএই এই ধরনের অভিযোগের প্রত্যাখ্যান করেছে এবং পূর্বে একই রকম অভিযোগের সঙ্গে সমানভাবে অস্বীকার করেছে। তবে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন যে ইউএইয়ের সামরিক উপস্থিতি ও তার মিত্রদের সহায়তা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে এবং মানবিক সংকটকে তীব্র করেছে।
বিশ্লেষক রাশিদ আল-হাসান, যিনি মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান, বলেন, “ইউএইয়ের গোপন কারাগারগুলো কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং অঞ্চলের কূটনৈতিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। সৌদি আরবের সঙ্গে ইউএইয়ের সম্পর্কের অবনতি ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে, তবে একইসাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়িয়ে তুলবে যাতে উভয় পক্ষই মানবিক নীতিমালা মেনে চলে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এই ধরনের প্রকাশনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, যা ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা দাবি করবে।
ইয়েমেনের সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের জন্য ভিসা প্রদান কঠিন করে তুলেছে, তবে এইবারের আমন্ত্রণটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারী প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বলেছে যে, এই ঘাঁটিগুলোতে আর কোনো গোপন কার্যক্রম নেই এবং তারা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইচ্ছুক।
অবশ্যই, এই ঘাঁটিগুলোর অবস্থান ও শর্তাবলী সম্পর্কে আরও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ইউএইকে এই গোপন কারাগারগুলো বন্ধ করে বন্দিদের মুক্তি দিতে আহ্বান জানাচ্ছে।
আঞ্চলিকভাবে, ইউএই ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের পরিবর্তন ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের গতিপথে নতুন মোড় আনতে পারে। যদি দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা শক্তিশালী হয়, তবে ইয়েমেনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে পারে এবং মানবিক সংকটের তীব্রতা কমতে পারে। অন্যদিকে, যদি সংঘাত অব্যাহত থাকে, তবে গোপন কারাগার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়তে পারে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
এই পরিদর্শনটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের গোপন দিকগুলোকে উন্মোচন করে এবং ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।



