কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এখন বিশ্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে নতুন দিক উন্মোচন করছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঔষধ গবেষণার সময় ও ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে। এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, কোন সমস্যার সমাধান দিচ্ছে এবং বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য কী সম্ভাবনা তৈরি করছে, তা নিচে বিশদে জানানো হল।
দশক ধরে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে ‘ইরুমের আইন’ নামে পরিচিত একটি বিরক্তিকর প্রবণতা দেখা যায়: কম্পিউটারের ক্ষমতা দ্বিগুণ হলেও নতুন ঔষধের উন্নয়নের খরচ প্রায় প্রতি নয় বছর পর দ্বিগুণ হয়। ১৯৬০-এর দশকে এক বিলিয়ন ডলারে দশটি নতুন ওষুধ তৈরি করা সম্ভব ছিল, আর আজ একই পরিমাণে একটিও ঔষধ তৈরি করা কঠিন।
এই ব্যয়বহুল প্রবণতা বিশেষভাবে কম আয়ের দেশগুলোকে প্রভাবিত করে, যেখানে সীমিত বাজেটের কারণে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের প্রাপ্যতা কমে যায়। ফলে কোটি কোটি মানুষ আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে।
AI এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা প্রদান করে। বর্তমান সময়ে একটি নতুন ওষুধ বাজারে আনার জন্য গড়ে দশ বছর এবং দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়, যার ব্যর্থতার হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। AI প্রযুক্তি এই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়, অর্থাৎ প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপকে দ্রুততর ও সাশ্রয়ী করে তুলতে সক্ষম।
প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপে গবেষকরা এক মিলিয়ন পর্যন্ত যৌগ স্ক্রিন করে এক বা দুইটি সম্ভাব্য প্রার্থী বেছে নেয়। এই ধাপটি মোট উন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় এক তৃতীয়াংশ গঠন করে। AI ব্যবহার করে এই স্ক্রিনিং প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করা হলে সময়ের ক্ষয় কমে এবং ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
উদাহরণস্বরূপ, AlphaFold 3 নামের একটি মডেল প্রায় সব জীবের অণুর গঠন পূর্বাভাস দিতে পারে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা মাসের পর মাসের পরীক্ষামূলক কাজকে কয়েক ঘণ্টার গণনা কাজেই রূপান্তরিত করতে পারেন, ফলে মানবিক ত্রুটি ও পুনরাবৃত্তি কমে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি AI স্টার্টআপ একটি নতুন ঔষধের লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে এবং মানব ক্লিনিকাল ট্রায়ালের জন্য উপযুক্ত অণু ডিজাইন করতে মাত্র ১৮ মাস সময় নিয়েছে, যার মোট ব্যয় ২.৭ মিলিয়ন ডলার। এই সংখ্যা ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির তুলনায় অল্পই, যেখানে একই কাজের জন্য দশ বছর ও কয়েক শত মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশের শক্তিশালী গৃহস্থালি ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের জন্য এই অগ্রগতি বিশেষ অর্থবহ। দেশটি বর্তমানে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে দক্ষ, তবে AI-র সহায়তায় গবেষণা ও উন্নয়নের স্তরে অগ্রসর হয়ে নিজস্ব উদ্ভাবনী ঔষধ তৈরি করতে পারে। এভাবে দেশীয় শিল্পের রূপান্তর গতি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে।
যদি AI গবেষণা ও উন্নয়নের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করতে পারে, তবে ওষুধের মূল্য কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কম দামের ওষুধের ফলে আফ্রিকা ও এশিয়ার মতো অঞ্চলের স্বাস্থ্য বাজেটের চাপ হ্রাস পাবে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সাশ্রয়ী চিকিৎসা সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্লোবাল সাউথের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় রূপান্তরমূলক পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত। এই প্রযুক্তি কীভাবে স্থানীয় গবেষণা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আরও সাশ্রয়ী ও কার্যকর ঔষধ তৈরি করতে পারে, তা ভবিষ্যতে নজর রাখার বিষয়।



