বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অবস্থা দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। অর্থ ও আর্থিক বাজার পণ্য‑সেবা ও শ্রম বাজারের মধ্যে সেতু গড়ে, যা অর্থনীতির গতি নির্ধারণ করে। এই সেতুর কোনো ত্রুটি পুরো অর্থনীতির কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে।
সিংগাপুর, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন পথ আর্থিক ব্যবস্থার সঠিক পরিচালনা থেকে উদ্ভূত। এই দেশগুলো কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্প ও সেবা খাতে রূপান্তরিত হয়ে আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও ব্যর্থতা উভয়ই আর্থিক খাতের গঠন ও পরিচালনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
আর্থিক খাতের অবনতির শিকড় ১৯৮০-এর দশকে ফিরে যায়, যখন সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী গড়ে তোলার জন্য ডিফল্ট ঋণ প্রদান শুরু করেন। এই নীতি ব্যবসায়িক স্বার্থ ও রাজনৈতিক সমর্থনকে একত্রিত করে, ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির ভিত্তি স্থাপিত হয়।
এরশাদের পরবর্তী সরকারগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ (এএল) ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি), এই প্রথা অব্যাহত রাখে। উভয় দলই আর্থিক সেক্টরে ঋণমুক্তি ও অনিয়মিত লেনদেনকে স্বাভাবিক বলে গণ্য করে, ফলে ঋণ ডিফল্টের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।
২০১৫ সালের পর থেকে এএল শাসনকালে অবনতি তীব্রতর হয়। ব্যবসায়িক টায়কুনরা ব্যাংকিং খাতে গোপন লাইসেন্স পেয়ে সম্পদ সঞ্চয় করে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই গোষ্ঠীর সমর্থন ছাড়া শাসনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে ওঠে, ফলে আর্থিক নীতি আরও দুর্নীতিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আগস্ট ২০২৪-এ এএল সরকার পতনের পর গৃহীত অস্থায়ী সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা পুনঃস্থাপন। তবে বাস্তবে ব্যাংকিং সেক্টরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা যায়নি, এবং বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধারেও অগ্রগতি সীমিত রয়ে গেছে।
অবস্থা এমন যে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে, ফলে ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতা উভয়েরই নগদ প্রবাহে চাপ বাড়ছে। এই চাপ সরাসরি শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে প্রভাব ফেলছে, যা দেশের জিডিপি বৃদ্ধিকে হ্রাস করছে।
বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস পেয়েছে, ফলে শেয়ারবাজারের লেনদেনের পরিমাণ কমে গেছে। বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের প্রবাহও আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে হ্রাসের মুখে। এই প্রবণতা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, আর্থিক খাতের সংস্কার না হলে ঋণ ডিফল্টের হার বাড়তে পারে, যা ব্যাংকিং সিস্টেমের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। একই সঙ্গে, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, ফলে কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে।
সরকারের বর্তমান নীতি প্রস্তাবের মধ্যে ঋণ পুনর্গঠন, দুর্নীতি বিরোধী আইন প্রয়োগ এবং আর্থিক তদারকি শক্তিশালীকরণ অন্তর্ভুক্ত। তবে এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, নইলে নীতির কার্যকারিতা সীমিত থাকবে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাংকিং সেক্টরে স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীল ঋণ প্রদান এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা মডেলকে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। এধরনের সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়াবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে।
সংক্ষেপে, আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে। অবিলম্বে সংস্কার না করা হলে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও খারাপ হবে, এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতি পাবে। তাই আর্থিক নীতি ও নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণই ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একমাত্র পথ।



