গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ এবং পররাষ্ট্র দপ্তর যৌথভাবে জানায় যে, দেশটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে গেছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে এক বছরের দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে শুরু হয়েছিল এবং বর্তমান প্রেসিডেন্টের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে; তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে সংস্থার সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়। বিশেষ করে কোভিড‑১৯ মহামারির সময়ে সংস্থার জরুরি স্বাস্থ্য সংকট ঘোষণা করতে বিলম্বের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে উঠে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকার দাবি করে যে, ডব্লিউএইচও তার মূল মিশন থেকে বিচ্যুত হয়ে এমন নীতি গ্রহণ করেছে যা আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে সংস্থার প্রধান আর্থিক দাতা, তবু নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে আমেরিকান নাগরিকদের স্বার্থকে যথাযথভাবে বিবেচনা না করার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কূটনৈতিক সূত্রের মতে, সদস্যপদ ত্যাগের পূর্বশর্ত হিসেবে বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ২৭ কোটি ডলারেরও বেশি বকেয়া রাখলেও, ডব্লিউএইচওর সংবিধান অনুসারে এই অর্থ পরিশোধে তারা আইনগত বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত বলে দাবি করে।
এই আর্থিক বিরোধের পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্লেষকরা সতর্কতা হিসেবে দেখছেন। এক কূটনীতিকের মতে, ডব্লিউএইচও থেকে প্রস্থান করা যুক্তরাষ্ট্রের সফট পাওয়ারের একটি ক্ষতি হতে পারে, কারণ সংস্থা বিশ্বজনীন স্বাস্থ্য নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে হোয়াইট হাউসের একটি বিবৃতি অনুযায়ী, সংস্থা থেকে বেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র গ্লোবাল হেলথ সেক্টরে তার প্রভাব বজায় রাখার পরিকল্পনা করেছে। এতে দ্বিপাক্ষিক স্বাস্থ্য চুক্তি, গবেষণা সহযোগিতা এবং মানবিক সহায়তা প্রোগ্রামকে জোর দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য বড় দেশগুলোর মধ্যে ডব্লিউএইচওর সদস্যপদ বজায় রাখার প্রবণতা দেখা যায়; ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও কানাডা সহ বেশিরভাগ দেশ সংস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান এই গোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নীতি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন যে, ডব্লিউএইচওর বাজেটের ঘাটতি বাড়তে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দাতা দেশের অবদান না থাকলে সংস্থার আর্থিক কাঠামোতে চাপ বাড়বে। এই পরিস্থিতি অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত অবদান আহ্বান করতে পারে অথবা সংস্থার কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য নীতি এখন আরও স্বতন্ত্রভাবে গঠন করা হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগে নতুন কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য হবে দেশীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।
ডব্লিউএইচওর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এখন আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে; সংস্থার নেতৃত্ব পুনর্গঠন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা উন্নত করার জন্য নতুন সংস্কার প্রস্তাব করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে, তবে একই সঙ্গে সংস্থার জন্য আর্থিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউএইচও থেকে সদস্যপদ প্রত্যাহার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরিবর্তন, যা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য শাসনব্যবস্থার গঠন ও কার্যক্রমে নতুন গতিপথ নির্ধারণ করবে। দেশটি এখন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে গ্লোবাল হেলথে তার প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করবে, আর ডব্লিউএইচওকে নতুন সদস্য ও দাতাদের সমর্থন নিয়ে তার মিশন চালিয়ে যেতে হবে।



