নাসার প্রাক্তন মহাকাশচারিণী সুনীতা উইলিয়ামস, ২৭ বছরের ক্যারিয়ার শেষে অবসর গ্রহণের পর সম্প্রতি তার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) এ কাটানো সময়ের আবেগগত দিকগুলো প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, শূন্যমাধ্যাকর্ষণে দীর্ঘ সময় থাকাকালীন তিনি কাঁদেছেন এবং ঘরে-পরিবারের সান্নিধ্য, বিশেষ করে তার কুকুরের কথা স্মরণে মনের ভেতরে একাকিত্বের অনুভূতি জাগ্রত হয়েছে।
একটি পডকাস্টে তিনি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন যে, মহাকাশে থাকা মানে কেবল শারীরিক চ্যালেঞ্জ নয়, মানসিক দিকেও নানা রকমের অনুভূতি মিশে থাকে। মানুষকে মিস করা, প্রিয় পোষা প্রাণীর কথা ভাবা—এইসবই তাকে অশ্রুতে ভেজিয়ে দিয়েছে।
উইলিয়ামসের শেষ মিশনটি জুন ২০২৪-এ বোয়িংয়ের স্টারলাইনার দিয়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হয়। প্রাথমিকভাবে মিশনের সময়সীমা মাত্র ৭ থেকে ১০ দিন নির্ধারিত ছিল, তবে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তাকে প্রায় ২৮৬ দিন পর্যন্ত স্টেশনে থাকতে হয়। শেষমেশ তিনি মার্চ ২০২৫-এ নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসেন।
মিশনের সময় তিনি এক বন্ধুর অসুস্থ মায়ের কথা স্মরণ করে বলেন, মহাকাশে থাকা সত্ত্বেও অন্যের মানসিক সমর্থন দেওয়া কঠিন। নিজের অনুভূতিগুলো সামলাতে হয়, আর অন্যকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করার সময় নিজেরই আবেগের ভার বাড়ে। তিনি জোর দেন, পৃথিবীর মতোই মহাকাশেও মানুষের অনুভূতি স্বাভাবিক এবং তা দমন করা উচিত নয়।
শূন্যমাধ্যাকর্ষণে কান্না করলে কী হয়, তা তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। চোখের জল ছোট ছোট বলের মতো হয়ে মুখের চারপাশে ভাসে, পানির মতো না গিয়ে। ঘামও একইভাবে ভাসে, ফলে টিস্যু দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে পরিষ্কার করতে হয়, নতুবা তা পরিবেশে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
মহাকাশে বাথরুম ব্যবহার করা তার মতে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কোনো জিনিস নিচে না পড়ার ভয় কাটিয়ে উঠতে প্রথমে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয়, তারপর সঠিক পেশি নিয়ন্ত্রণ শিখতে হয়। এই প্রক্রিয়া না হলে অপ্রয়োজনীয় লিকেজ বা দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি থাকে।
ইন্ডিয়ার রাতের দৃশ্য তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। পৃথিবীর উপরে থেকে দেখলে ভারতের শহরগুলো সাদা আলোয় জড়িয়ে এক জালের মতো দেখায়, যেন স্নায়ু সংযোগের নেটওয়ার্ক। এই দৃশ্য তাকে দেশের সমৃদ্ধি ও সংহতির অনুভূতি দেয়।
দিনের আলোয় তিনি হিমালয়ের শিলারেখা ও পূর্ব উপকূলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে প্রশংসা করেন। হিমালয় দেখলে টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষে গঠিত পর্বতমালার গঠন স্পষ্ট হয়, আর পূর্বের নদীর মোহনায় পানির রঙ ও ঘূর্ণন তার দৃষ্টিকে মুগ্ধ করে।
সুনীতা উইলিয়ামসের কথায় স্পষ্ট যে, মহাকাশে থাকা মানে শারীরিক সীমা ছাড়িয়ে মানসিক দিকেও প্রস্তুতি প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘ সময়ের মিশনে মানসিক সহায়তা ও আত্ম-পরিচর্যার ব্যবস্থা অপরিহার্য, যাতে মহাকাশচারীরা স্বাভাবিকভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ মহাকাশ মিশনের পরিকল্পনাকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল, প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সেশনকে আরও জোরদার করা। সঠিক মানসিক সমর্থন ব্যবস্থা থাকলে দীর্ঘমেয়াদী মিশনে স্ট্রেস কমে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ে।
আপনার মতে, মহাকাশে কাজ করা বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কী ধরনের সমর্থন ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে? আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের জন্য একটি সুস্থ মানসিক পরিবেশ গড়ে তোলার পথে একসাথে চিন্তা করি।



