ইন্দোনেশিয়ার মাকাসার প্রদেশে শনিবার সন্ধ্যায় ঘটিত বিমান দুর্ঘটনার শেষ মৃতদেহ শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনায় মোট দশজন যাত্রী ও ক্রু সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যার মধ্যে দুইজনের পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে।
বিমানটি ইন্দোনেশিয়া এয়ার ট্রান্সপোর্টের পরিচালিত এটি আর ৪২-৫০০ মডেল, যা জাকার্তা থেকে দক্ষিণ সুলাওয়েসির রাজধানী মাকাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিল। যাত্রার মাঝামাঝি সময়ে, পাইলট এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেন এবং মারোস জেলায় অচেনা এলাকায় নেমে পড়ে।
জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থা (বাসারনাস) মাকাসার কার্যালয়ের কর্মকর্তা আন্ডি সুলতান ডেটিক জানান, সন্ধ্যাবেলায় শেষ মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে এবং তা নিরাপত্তা দল দ্রুত উদ্ধার করেছে। এই উদ্ধার কাজের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত দল ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।
এ পর্যন্ত, দুইজন নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে: কেবিন ক্রু সদস্য ফ্লোরেন্সিয়া লোলিতা এবং সামুদ্রিক বিষয়ক ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা দেদেন মৌলানা। উভয়ই মন্ত্রণালয়ের নজরদারি মিশনে নিযুক্ত ছিলেন, যা বিমানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল।
বাকি আটজনের অবস্থা এখনও অজানা, এবং অনুসন্ধান দল তাদের দেহের সন্ধানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিমানটির সুনির্দিষ্ট ধ্বংসের কারণ এখনো তদন্তের অধীনে, তবে প্রাথমিক বিশ্লেষণে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা আবহাওয়ার প্রভাব সম্ভাব্য বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনা ইন্দোনেশিয়ার সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বিমান চলাচল ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলেছে। ইন্দোনেশিয়া ও তার প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্যিক ও সামরিক উভয় ধরনের বিমান চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিরাপত্তা মানদণ্ডের পুনর্বিবেচনা প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে ASEAN নিরাপত্তা ফোরাম সম্প্রতি একাধিক কর্মশালা আয়োজন করেছে। একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “ইন্দোনেশিয়ার মতো বৃহৎ দ্বীপপুঞ্জে বিমান দুর্ঘটনা দ্রুত সাড়া এবং সমন্বিত অনুসন্ধানকে চ্যালেঞ্জ করে, তাই আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য।”
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ঘটনাটির পর প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, “আমরা ASEAN সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য শেয়ারিং ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়াব, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ট্র্যাজেডি কমে।” এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে, ইন্দোনেশিয়া আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার (ICAO) সঙ্গে নিরাপত্তা মানদণ্ডের পুনর্মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
বিমান দুর্ঘটনা তদন্তের জন্য ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা একটি স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করেছে, যার সদস্যদের মধ্যে বিমান নির্মাতা, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বিশেষজ্ঞ এবং সামুদ্রিক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত। কমিটি আগামী সপ্তাহে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের লক্ষ্য নিয়েছে, যাতে দুর্ঘটনার মূল কারণ নির্ধারণ করা যায়।
স্থানীয় জনগণ ও পরিবারগুলোর শোকের মধ্যে, সরকার জরুরি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা মৃতদেহ পুনরুদ্ধার, দেহের পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং বেঁচে থাকা যাত্রীদের চিকিৎসা সহায়তা অন্তর্ভুক্ত করবে। এছাড়া, মাকাসার প্রদেশের প্রশাসন পুনরুদ্ধারকৃত দেহের সুষ্ঠু সমাহার নিশ্চিত করতে স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করবে।
এই ঘটনার পর, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইন্দোনেশিয়ার বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্বকে পুনরায় জোর দিচ্ছেন। বিশেষ করে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত সামুদ্রিক এলাকা ও বহু দ্বীপের পরিবহন নেটওয়ার্কে নিরাপদ বিমান চলাচল নিশ্চিত করা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
বিমান দুর্ঘটনার পুরো পরিণতি এখনো স্পষ্ট নয়, তবে অনুসন্ধান দল ও সরকারী সংস্থাগুলি দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, দেহ পুনরুদ্ধার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার ফলাফল ইন্দোনেশিয়ার বিমান ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নীতির ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



