দ্বিতীয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তালিকায় ২১টি জেলায় একেবারেই নারী প্রার্থী নাম না থাকায় নারী প্রতিনিধিত্বের অবস্থা তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১,৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮২ জন নারী, যা মোট প্রার্থীর ৪ শতাংশের কাছাকাছি। এদের মধ্যে ৭৩টি আসনে লড়াই করছেন, ফলে দেশের মোট আসনের প্রায় ২৪.৩ শতাংশে নারী প্রার্থীর উপস্থিতি সীমিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির আশার আলো জ্বলে উঠলেও, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণের হার প্রত্যাশার তুলনায় কমে গেছে। দলীয় স্বার্থ, আসন সমঝোতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে কেন্দ্র করে গঠিত কৌশলগুলোকে নারীরা প্রায়শই বাদ পড়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারীর প্রার্থী সংখ্যা হ্রাসের পেছনে জোটের রাজনীতি এবং ইসলামি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উত্থানকে প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে, স্বামীর বিকল্প হিসেবে নারীর নাম প্রস্তাবিত হলেও, স্বামীর প্রার্থীতা বজায় থাকায় বহু নারী প্রার্থী পদত্যাগ করে। তবু, কিছু দলীয় প্রতীকী ভোটের জন্য এবং আসন নিশ্চিত করতে, বিএনপি জোটে না গিয়ে কিছু আসনে নিজস্বভাবে নারী প্রার্থী দাখিল করেছে, যা সামগ্রিক চিত্রকে কিছুটা পরিবর্তন করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নিম্নলিখিত ২১টি জেলায় কোনো নারী সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নেই: পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, ভোলা, কক্সবাজার, ফেনী, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী। এই জেলাগুলোতে নারী প্রার্থীর অনুপস্থিতি নির্বাচনী সমতা অর্জনে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দলীয় ভিত্তিতে দেখা যায়, এনসিপি থেকে মাত্র দুইজন নারী প্রার্থী রয়েছে—দিলশানা পারুল (ঢাকা-১৯) ও নাবিলা তাসনিদ (ঢাকা-২০)। এবি পার্টির একমাত্র নারী প্রার্থী হলেন নাসরীন সুলতানা। অন্যদিকে, বিএনপি থেকে নয়জন নারী প্রার্থী দাখিল করেছে, যা মোট প্রার্থীর ৩.১২ শতাংশের সমান। এছাড়া, বিএনপির সাথে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো থেকে অন্তত পনেরোজন নারী প্রার্থী তালিকাভুক্ত হয়েছে।
জাতীয় পার্টি থেকেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা সীমিত, যদিও পুরো তালিকায় ২০টি রাজনৈতিক দল থেকে মোট ৬৩জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই সংখ্যা দেখায় যে, যদিও কিছু দল নারী প্রার্থীর সমর্থনে পদক্ষেপ নিয়েছে, তবু সামগ্রিকভাবে নারীর অংশগ্রহণের হার এখনও কম।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, জোট গঠন ও আসন ভাগাভাগির প্রক্রিয়ায় নারী প্রার্থীর স্থান প্রায়শই তুচ্ছ করা হয়। এছাড়া, ইসলামি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উত্থান ও তাদের প্রার্থনা তালিকায় নারীর কম উপস্থিতি এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, কিছু দলীয় প্রতীকী ভোটের জন্য এবং নির্দিষ্ট আসনে নারীর নাম দাখিলের মাধ্যমে তারা এই বৈষম্যকে সাময়িকভাবে কমাতে চেষ্টা করছে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, নারী প্রতিনিধিত্বের এই নিম্ন স্তর পার্লামেন্টে নারীর অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার সংক্রান্ত আলোচনার গতি ধীর করতে পারে। নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে, যদি নারীর সংখ্যা বাড়তে না পারে, তবে সরকারী নীতি ও আইন প্রণয়নে নারীর দৃষ্টিকোণ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। তাই, রাজনৈতিক দলগুলোকে আসন ভাগাভাগি ও ক্যান্ডিডেট নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য স্পষ্ট নীতি গ্রহণের আহ্বান করা হচ্ছে।
সংক্ষেপে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণের হার ৪ শতাংশের কাছাকাছি, এবং ২১টি জেলায় একেবারেই নারী প্রার্থী নেই। দলীয় স্বার্থ, জোটের গঠন ও ইসলামি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উত্থান এই পরিস্থিতি গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে দলীয় নীতি ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সমন্বয় প্রয়োজন, নতুবা পার্লামেন্টে নারীর স্বর যথাযথভাবে শোনা যাবে না।



