ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুলাওয়েসি প্রদেশের মারোস এলাকায় শনিবার দুপুর ১:৩০ টার দিকে ইন্ডোনেশিয়া এয়ার ট্রান্সপোর্ট (আইএটি) মালিকানাধীন ATR ৪২-৫০০ টার্বোপ্রপ বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। মৎস্য ও সমুদ্র বিষয়ক মন্ত্রণালয় মাছের ওপর নজরদারি করার জন্য ভাড়া নেয়া এই বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার পর ১০ জন, যার মধ্যে সাতজন ক্রু ও তিনজন মন্ত্রণালয়ের কর্মী, মৃত্যুবরণ করেছে।
বিমানটি যখন হঠাৎ সিগন্যাল হারায়, তখন তা মারোসের বুলুসারাউং পর্বতের কাছাকাছি উড্ডয়ন করছিল। স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা জাকার্তা থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই অঞ্চলে ধ্বংসাবশেষের টুকরো আলাদা‑আলাদা স্থানে খুঁজে পায়। উদ্ধার দল দ্রুতই নিশ্চিত করে যে সব অংশই একে অপরের কাছাকাছি, যা দুর্ঘটনার স্থানকে সংকীর্ণ করে নির্ধারণে সহায়তা করবে।
বিমানটির ব্ল্যাকবক্স, যা উড্ডয়নের শেষ মুহূর্তের ডেটা রেকর্ড করে, বর্তমানে বিশ্লেষণের অধীনে রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি কমিটি (কেএনকেটি) এর প্রধান জানান, ফলাফল প্রকাশের জন্য কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। কেএনকেটি দেশের সব ধরনের পরিবহন দুর্ঘটনা তদন্তের দায়িত্বে থাকে এবং এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা মানদণ্ডের পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
এই দুর্ঘটনা ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ঘটিত কয়েকটি বিমান‑সংক্রান্ত ঘটনার ধারাবাহিকতা রূপে দেখা যায়। ২০২২ সালে জাকার্তা‑সুমাত্রা রুটে একটি কমার্শিয়াল ফ্লাইটের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া এবং ২০২৪ সালে একটি সামরিক ট্রেনার বিমান হ্রদে ডুবে যাওয়া ঘটনাগুলি দেশের এভিয়েশন নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সংস্থা (ICAO) ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়াকে নিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত নির্দেশনা প্রদান করেছে।
এশিয়া‑প্যাসিফিক অঞ্চলে বিমান নিরাপত্তা নিয়ে চলমান আলোচনায় ইন্দোনেশিয়ার এই ঘটনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এশিয়ান এয়ারলাইনস অ্যাসোসিয়েশন (AAPA) এর একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “এধরনের দুর্ঘটনা শুধু জাতীয় নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা নেটওয়ার্ককে প্রভাবিত করে; তাই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য শেয়ারিং ও সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।”
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই ঘটনার পর প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর কথা প্রকাশ করেছে। তারা উল্লেখ করেছে যে, ভবিষ্যতে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ও মাছ ধরা সংক্রান্ত বিমান পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা এবং জরুরি অবস্থায় পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি শক্তিশালী করা হবে।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা সংস্থা ASEAN এও এই ঘটনার পর দ্রুত একটি জরুরি সভা আহ্বান করেছে। সভায় সদস্য দেশগুলোকে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ মিশনের নিরাপত্তা প্রোটোকল পুনর্বিবেচনা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা সমন্বয় করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিমানের ধ্বংসাবশেষের বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে, বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য কারণ হিসেবে খারাপ আবহাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা ন্যাভিগেশন সিস্টেমের ত্রুটি উল্লেখ করছেন। তবে, বর্তমান পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যা একক কারণকে নিশ্চিত করে।
ইন্দোনেশিয়ার মৎস্য মন্ত্রণালয় এই দুর্ঘটনা নিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করে, এবং মৃত কর্মীদের পরিবারকে সমর্থন ও ক্ষতিপূরণ প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয়। একই সঙ্গে, তারা ভবিষ্যতে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ মিশনের জন্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম আপডেটের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে কেএনকেটি কর্তৃক প্রস্তুত করা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে, যা দুর্ঘটনার মূল কারণ এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারণ করবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই প্রতিবেদনের ফলাফলকে এশিয়ার সামগ্রিক বিমান নিরাপত্তা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখবে।
এই ঘটনাটি ইন্দোনেশিয়ার বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে এবং এশিয়া‑প্যাসিফিক অঞ্চলের সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ও পরিবহন নিরাপত্তা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বকে পুনরায় জোরদার করেছে।



