ইউক্রেনের পশ্চিমে অবস্থিত খমেলনিৎসকি পারমাণবিক কেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল স্তম্ভে পরিণত হয়েছে, যখন রাশিয়ার অবিরাম আক্রমণ দেশের জ্বালানি সংকটকে তীব্র করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে পারমাণবিক শক্তি দেশের সামরিক ও নাগরিক চাহিদা পূরণে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খমেলনিৎসকি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কয়েকজন প্রযুক্তিবিদ বিশাল স্ক্রিনের সামনে মনোযোগ সহকারে কাজ করছেন, যেখানে প্রতিটি মিটার এবং রিঅ্যাক্টরের অবস্থা রিয়েল‑টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের কাজের সূক্ষ্মতা এবং তীব্রতা দেশের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইউক্রেনের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬০% খমেলনিৎসকি এবং দুটো অন্যান্য পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে উৎপন্ন হয়। এই তিনটি কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা দেশের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
ইউক্রেনের জাতীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা এনারগোঅ্যাটমের প্রধান পাভলো কোভটোনিউক জানান, এই সুবিধাগুলি রাশিয়ার আক্রমণের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাশিয়া পারমাণবিক কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত সাবস্টেশনগুলোকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, যা কেন্দ্রের নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা নিশ্চিত করে।
এধরনের আক্রমণকে তিনি “পারমাণবিক সন্ত্রাসবাদ” হিসেবে বর্ণনা করেন, কারণ সাবস্টেশন ও রিঅ্যাক্টরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে।
পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সীমিত প্রবেশাধিকার নিয়ে পরিচালিত হয়। এই গোপনীয়তা ভঙ্গ না করে একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা সম্প্রতি এখানে সীমিত প্রবেশের অনুমতি পেয়েছে, যাতে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি প্রতিবেদন করা যায়।
রাতারাতি শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আক্রমণ চলতে থাকায় ইউক্রেন রাশিয়ার সমালোচনামূলক জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর অভিযোগ করে। এই ধারাবাহিক হুমকি দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি উল্লেখ করেন, রাশিয়া শীতের তীব্রতা কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ, তাপ এবং পানির সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করে জনগণের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ তাপ ও পানির অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন।
রাশিয়ার বোমাবর্ষণের ফলে অধিকাংশ প্রচলিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেছে, তাই পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো এখন দেশের প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহের উৎস হিসেবে কাজ করছে। এই পরিবর্তন যুদ্ধের সময় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পারমাণবিক শক্তির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
দক্ষিণে ডনিপ্রো নদীর তীরবর্তী জাপোরিজহিয়া পারমাণবিক কেন্দ্র, যা ইউক্রেনের সর্ববৃহৎ এবং ইউরোপেরও অন্যতম বৃহৎ, যুদ্ধের শুরুর পর থেকে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই কেন্দ্রের দখল ইউক্রেনের জ্বালানি কৌশলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
খমেলনিৎসকি ও অন্যান্য পারমাণবিক কেন্দ্রের অব্যাহত কার্যক্রম দেশের সামরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বেসামরিক জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা না থাকলে হাসপাতাল, যোগাযোগ এবং পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে, যা সামগ্রিক যুদ্ধের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, এবং ইউক্রেনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত সহায়তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রস্তাবিত হচ্ছে। পরবর্তী কয়েক মাসে রাশিয়ার আক্রমণ তীব্রতা বাড়তে পারে, তাই বিদ্যুৎ গ্রিডের রক্ষণাবেক্ষণ ও পারমাণবিক কেন্দ্রের সুরক্ষায় অতিরিক্ত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।



