থাকুরগাঁওয়ের একটি বাড়িতে ৫ আগস্ট বিকেল পাঁচটায় অগ্নিকাণ্ড ঘটায় চারজনের মৃত্যু। ঘটনাটি ছাত্র-জনতা আন্দোলনের সময় ঘটে, যেখানে শিবিরে অংশগ্রহণকারী চারজনকে আওয়ামী লীগের কর্মীরা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেহ দগ্ধ করে। শিকারের মধ্যে রাকিবুল ও রায়হানসহ দুই তরুণ অন্তর্ভুক্ত, যাঁদের পরিবার পরে দু’টি পৃথক মামলা দায়ের করে।
রাকিবুলের পিতা জাকির হোসেন ২১ আগস্ট সদর থানায় প্রথম মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ৭৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজানা ১৫০‑২০০ জনকে অতিরিক্ত আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। একই সময়ে রায়হানের পিতা ফজলে আলম আদালতে আরেকটি মামলা দায়ের করেন, যা ১১ সেপ্টেম্বর সদর থানায় গ্রহণ করা হয়। এই মামলায় ৯১ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং একই রকম অজানা ১৫০‑২০০ জনকে আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়।
দুইটি পৃথক মামলার ফলে আদালত উভয়কে একত্র করে একটি সংযুক্ত মামলায় রূপান্তর করে। সংযুক্ত মামলায় মোট ২০৫ জনকে আসামি হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। মামলার প্রাথমিক তদন্ত সদর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক বাবুল হোসেনের তত্ত্বাবধানে শুরু হয়, পরে দায়িত্বে এসআই মুয়িদ খান ও বর্তমান এসআই শফিউল ইসলাম নেয়। শফিউল ইসলাম ২১ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের সময় জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীর পরিবার থেকে প্রাপ্ত নামের ভিত্তিতে আসামি তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা শিকারের পরিবারকে হুমকি দিয়ে আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। হুমকি উপেক্ষা করে শিকারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনা করা হয়। ৫ আগস্ট বিকেলে শিকারা বালিয়াডাঙ্গি মোড়ে পৌঁছালে, নেতা-কর্মীরা কৌশলে তাদের একরামুদ্দৌল্লা নামের সাবেক কাউন্সিলরের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে শিকারা যদি অস্বীকার করে, তবে গ্যাস সিলিন্ডার খুলে আগুন জ্বালিয়ে ঘর থেকে পালিয়ে যায়। ফলস্বরূপ চারজন দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
শিকারের পরিবার আদালতে দাবি করে যে, শিকারা হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কারণ তারা হুমকি সত্ত্বেও আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিল। মামলায় উল্লেখিত ‘জুলাই শহীদ’ তালিকাভুক্তির বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে; শিকারা ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন’ অধ্যাদেশের সংজ্ঞা উপেক্ষা করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক তদন্তে শফিউল ইসলাম জানান, শিকারা মৃত্যুর আগে তাদের বাবা-মা ও বন্ধুদের কাছে আসামিদের নাম জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা ভিত্তি করে নামগুলোকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে মামলায় ২০৫ জনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে অধিকাংশের পরিচয় অজানা। আদালত এখন পর্যন্ত কোনো রায় দেয়নি; পরবর্তী শুনানির তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি।
অভিযুক্তদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মীর নামও রয়েছে, তবে তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো গ্রেফতার বা জমানত আরোপের তথ্য প্রকাশিত হয়নি। জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ইন্দ্রনাথ রায় মামলার আরজিতে উল্লেখ করেন, যে রাজনৈতিক হুমকি ও গৃহহিংসা শিকারের মৃত্যুর মূল কারণ। তিনি আরও বলেন, আইনগত প্রক্রিয়া দ্রুততর হওয়া দরকার, যাতে শিকারের পরিবার ন্যায়বিচার পেতে পারে।
এই মামলায় ব্যবহৃত ‘ঢালাও’ অভিযোগও উঠে এসেছে; দুইটি পৃথক মামলায় একই ঘটনার জন্য একাধিক ব্যক্তি একসাথে দায়ের করা হয়েছে, যা শিকারের পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে ‘আসামি-ধারার’ অতিরিক্ত ব্যবহার হিসেবে সমালোচনা করতে বাধ্য করেছে।
সামগ্রিকভাবে, থাকুরগাঁওয়ের এই অগ্নিকাণ্ডে চারজনের প্রাণহানি, ২০০‑এর বেশি আসামি এবং রাজনৈতিক হুমকির মিশ্রণ একটি জটিল আইনি প্রক্রিয়ার সূচনা করেছে। আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নজর থাকবে, যাতে শিকারের পরিবার ও সমাজের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।



