বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ আটটি সর্বনিম্ন ব্যাংক হিসাবধারী দেশের একটি তালিকায় স্থান পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.৩০ বিলিয়ন মানুষ ব্যাংক হিসাবের বাইরে রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করে।
বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাবহীন জনসংখ্যা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। মোট ১.৩০ বিলিয়ন অ্যানবাঙ্কডের মধ্যে ৭০ কোটি নারী অন্তর্ভুক্ত, যা মোটের ৫৫ শতাংশ। এছাড়া, ৬৭ কোটি মানুষ (প্রায় অর্ধেক) বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশের মধ্যে পড়ে। শিক্ষার দিক থেকে ৭৯ কোটি (৬২ শতাংশ) প্রাথমিক স্তর বা তার নিচের শিক্ষার অধিকারী, আর ৬৯ কোটি (৫৪ শতাংশ) কর্মসংস্থানের বাইরে বা বেকার।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অ্যানবাঙ্কডদের মধ্যে ৩৮ কোটি (২৯ শতাংশ) ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সের, ৫৯ কোটি (৪৬ শতাংশ) ২৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সের, এবং ৩২ কোটি (২৫ শতাংশ) ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সের। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায় যে তরুণ ও মধ্যবয়সী জনগোষ্ঠীর বড় অংশই এখনও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে।
অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি ও ডিজিটাল রূপান্তরের আলোচনার মাঝেও, বিশাল সংখ্যক মানুষ ব্যাংকিং সেবার সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। শা. মো. আহসান হাবীব, বিআইবিএমের অধ্যাপক, উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র হিসাব খোলা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে না; ঋণ, বীমা ও অন্যান্য মূল আর্থিক পণ্যগুলোর প্রবেশাধিকারই প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি গড়ে তোলে। জনগণ যখন এই সেবাগুলোর ব্যবহারিক সুবিধা বুঝবে, তখনই তারা আর্থিকভাবে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হবে।
বিশ্বব্যাংক অ্যানবাঙ্কডদের মুখোমুখি ছয়টি প্রধান বাধা চিহ্নিত করেছে: পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব, আর্থিক সেবার উচ্চ ফি, পরিবারের অন্য সদস্যের ইতিমধ্যে থাকা হিসাব, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব, প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাস এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি। এই তালিকায় সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে অধিকাংশ মানুষই পর্যাপ্ত অর্থের অভাবকে উল্লেখ করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, মিশরে অ্যানবাঙ্কডদের ৯০ শতাংশই জানান যে তাদের কাছে হিসাব খোলা ও পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই। একই সঙ্গে, উচ্চ ফি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে উঠে এসেছে, যা অনেককে সাশ্রয়ী মূল্যের বিকল্প খোঁজার দিকে ধাবিত করেছে।
বাংলাদেশে এই বাধাগুলো মোকাবিলার জন্য মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার ও নেটওয়ার্ক কভারেজের সুবিধা নিয়ে, সস্তা ও সহজলভ্য হিসাব খোলার চাহিদা বাড়ছে। তবে, সেবা প্রদানকারীদের জন্য ফি হ্রাস, ব্যবহারকারীর আস্থা বৃদ্ধি এবং নথিপত্রের সরলীকরণ জরুরি।
অগ্রগতির দিক থেকে, যদি সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই বাধাগুলোকে সমাধান করতে পারে, তবে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বাড়বে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি দ্রুততর হবে। অন্যদিকে, ফি বৃদ্ধি, দূরবর্তী শাখা ও কাগজপত্রের জটিলতা বজায় থাকলে, অ্যানবাঙ্কড জনসংখ্যা বাড়তে পারে, যা অর্থনৈতিক বৈষম্যকে তীব্র করবে। তাই, নীতি নির্ধারকদের জন্য এখনই সময় সাশ্রয়ী, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য আর্থিক পণ্য চালু করা, যাতে বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।



