গাজা উপত্যকায় রূপান্তরিত এক ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, আর ইসরায়েলি অবরোধের ফলে স্বাস্থ্যসেবা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। দু’বছরের সামরিক সংঘাতের পরেও অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও, ত্রাণ সামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো রোগেও রোগীর প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে মৃত্যুর হার বাড়ছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মীরা জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহে ভাইরাসটি পুরো উপত্যকায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পরীক্ষার সুযোগ সীমিত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে ভাইরাসের সঠিক প্রকার এখনো চিহ্নিত করা যায়নি।
একটি দুঃখজনক উদাহরণে, দুই বছর আগে বোমা হামলা থেকে বেঁচে থাকা ৮ বছর বয়সী একটি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। তার পরিবার জানায়, শিশুটি সাধারণ সর্দি-জ্বরেও শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত ভাইরাসের কারণে মারা গিয়েছিল। এই ঘটনা গাজার স্বাস্থ্য সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
গাজার আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের পরিচালক উল্লেখ করেন, উপত্যকায় এমন কোনো বাড়ি নেই যেখানে একজনও এই রোগে আক্রান্ত হয়নি। তিনি অনুমান করেন, এটি ইনফ্লুয়েঞ্জার কোনো পরিবর্তিত রূপ অথবা কোভিড-১৯ এর নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্ট হতে পারে। তবে বর্তমানে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব রয়েছে।
হাসপাতালগুলিতে জরুরি রোগীর ভর্তি সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ রোগীর লক্ষণ ফুসফুসে সংক্রমণ, উচ্চ জ্বর এবং শ্বাসকষ্টের সঙ্গে যুক্ত। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা সীমিত অক্সিজেন সরবরাহের ওপর নির্ভর করে রোগীর মৌলিক সহায়তা প্রদান করছেন।
গাজার স্বাস্থ্য অবকাঠামো পূর্বের ইসরায়েলি হামলায় বারবার ধ্বংস হয়েছে, ফলে চিকিৎসা সেবা প্রদান কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রানতিসি হাসপাতাল একসময় ক্যান্সার ও কিডনি রোগের প্রধান কেন্দ্র ছিল, কিন্তু এখন সেখানে কেবল সংক্রামক রোগের চিকিৎসা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গাজার ৫৫ শতাংশ জরুরি ওষুধের সরবরাহ শূন্য এবং ৭১ শতাংশ মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জাম অনুপলব্ধ বলে জানানো হয়েছে। ওষুধের অভাবে চিকিৎসকরা প্রায়শই রোগীর কেবল অক্সিজেন প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকেন।
দীর্ঘস্থায়ী অনাহার ও অপুষ্টি গাজার জনসংখ্যার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করেছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং গর্ভবতী নারীরা এই সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকেই মৌলিক পুষ্টি না পেয়ে রোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাইরাসের প্রকৃত প্রকৃতি নির্ণয় ও উপযুক্ত টিকাদান বা চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা কঠিন। সীমিত ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা গাজার মানবিক সংকট মোকাবিলায় ত্বরিত সহায়তা আহ্বান করেছে। তবে অবরোধের কারণে ত্রাণ সামগ্রী গাজার সীমান্তে আটকে রয়েছে, ফলে রোগীর জরুরি চাহিদা পূরণে বড় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে গাজার বাসিন্দাদের জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, পরিষ্কার পানীয় জল ব্যবহার এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা জরুরি। যদিও সরবরাহ সীমিত, তবু স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও এনজিওগুলো খাবার ও পরিষ্কার পানি বিতরণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক ত্রাণের দ্রুত প্রবেশের জন্য গ্লোবাল কমিউনিটিকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। অবরোধের শিথিলতা, চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ এবং টিকাদান প্রোগ্রামের দ্রুত বাস্তবায়ন এই সংকটের তীব্রতা কমাতে সহায়ক হবে।
গাজার জনগণ এই কঠিন সময়ে সহনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে অব্যাহত স্বাস্থ্য সংকটের মুখে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় হস্তক্ষেপই একমাত্র বাস্তব সমাধান হতে পারে। গাজার ভবিষ্যৎ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।



