ইউক্রেন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রতিনিধিরা চার বছর ধরে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সমাপ্তি লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো একত্রিত হচ্ছেন। এই ত্রিপক্ষীয় শীর্ষসভার আয়োজন সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে নির্ধারিত, যেখানে দু’দিনের আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়ার মূল ধাপগুলো নির্ধারণের আশা করা হচ্ছে।
২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে গভীর পরিবর্তন এসেছে। যুদ্ধের দীর্ঘায়ু সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমঝোতা অর্জিত হয়নি।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) জানিয়েছেন, আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শীর্ষসভার সময়সূচি শুক্রবার ও শনিবার নির্ধারিত। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই বৈঠকটি যুদ্ধবিরতির দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
আবুধাবি নির্বাচনটি ডেভসের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাইডলাইনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির সরাসরি আলোচনার পর প্রকাশিত হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের শাসনকালে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সমাধানে ত্বরান্বিত কূটনৈতিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা হিসেবে এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠককে বিশাল অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জেলেনস্কি এই বৈঠককে “উৎসাহজনক পদক্ষেপ” বলে বর্ণনা করে, এবং জানিয়েছেন যে ইউক্রেনের নিরাপত্তা গ্যারান্টির শর্তাবলি ইতিমধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া, যুদ্ধ পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়া প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মতে, শান্তি আলোচনার অগ্রগতি এখন একমাত্র অমীমাংসিত বিষয়ের দিকে আটকে রয়েছে, যা সমাধানযোগ্য বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। এই বিষয়টি মূলত দখলকৃত ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং জাপোরিজিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা সংক্রান্ত।
ট্রাম্পের নিকটস্থ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও মস্কোতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। মস্কোতে আলোচনার পর, কুশনার এবং উইটকফ দুজনেই সরাসরি আবুধাবিতে গিয়ে ত্রিপক্ষীয় “মিলিটারি টু মিলিটারি” ওয়ার্কিং গ্রুপে অংশ নেবেন, যা সামরিক স্তরে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।
ডেভসের সময় জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাতের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পুতিনের প্রতি তার স্পষ্ট বার্তা হল—যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো শর্তে সংঘাতের অব্যাহতিকরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
জেলেনস্কি একই সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করে উল্লেখ করেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের মূল দায়ী ব্যক্তি এখনো মুক্ত অবস্থায় রয়েছেন, এবং তার জব্দকৃত সম্পদ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করা হচ্ছে না। এই মন্তব্যটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা নীতির পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে দখলকৃত অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং জাপোরিজিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা ইস্যু উভয় পক্ষই উল্লেখ করেছে। এই বিষয়গুলো সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।
আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় শীর্ষসভার ফলাফল পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের ভিত্তি গঠন করবে। যদি নিরাপত্তা গ্যারান্টি এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন চুক্তি চূড়ান্ত হয়, তবে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার এবং যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন সম্ভব হতে পারে। তবে রাশিয়ার শর্তাবলি এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন কীভাবে সমন্বিত হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
এই বৈঠকটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন এবং ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ত্রিপক্ষীয় আলোচনার ফলাফল কেবলমাত্র যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নতুন দিক নির্ধারণের সম্ভাবনা তৈরি করবে।



