চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের অভিযান চলাকালীন র্যাব‑৭-এর উপসহকারী পরিচালক নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। ঘটনাটি ঘটেছে গত সোমবার বিকেল চারটার দিকে, যখন র্যাব সদস্যরা সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন।
র্যাবের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে মোহাম্মদ ইয়াসিনকে চিহ্নিত করে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় ইয়াসিনের পাশাপাশি নুরুল হক ভান্ডারীসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, আর অতিরিক্ত ২০০ জনকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, র্যাব সদস্যদের ওপর সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠি ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। সেই সময় র্যাবের একটি আটক করা সন্দেহভাজনকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং চারজন র্যাব সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।
অভিযানের সময় র্যাবের সদস্যদের কেন এই এলাকায় অভিযান চালিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মোহাম্মদ ইয়াসিন। তিনি জঙ্গল সলিমপুরের অভিযানের সততা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তদন্তের দাবি জানান। এছাড়া চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের প্রাক্তন যুগ্ম সম্পাদক (বহিষ্কৃত) রোকন উদ্দিনকে অস্থিরতার জন্য দায়ী করেন।
যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহীদুর রহমান উল্লেখ করেন যে, এই অভিযানে ৫০‑এরও বেশি র্যাব সদস্য অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি জঙ্গলের ভূগোলিক বৈশিষ্ট্য ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে, এলাকাটির কঠিন পাহাড়ি ভূখণ্ডকে সন্ত্রাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে উল্লেখ করেন।
জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান বায়েজিদ বস্তামির পশ্চিমে দুই কিলোমিটার দূরে, লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩,১০০ একর বিস্তীর্ণ। যদিও সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত, তবে শহরের নিকটবর্তী হওয়ায় কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। পূর্বে হাটহাজারী উপজেলা, দক্ষিণে বায়েজিদ বস্তামি থানা এই এলাকাকে সীমাবদ্ধ করে।
এলাকার ভূখণ্ডের কঠিনতা ও অবৈধ বসতির বিস্তার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর স্থায়িত্বকে বাড়িয়ে তুলেছে। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গিয়ে হাজার হাজার অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে, এবং এখনো প্লট-বাণিজ্য ও পাহাড় কাটা চলমান। এই অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে সন্ত্রাসী বাহিনী এলাকায় অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করে, ফলে সশস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোরভাবে বজায় থাকে।
জঙ্গল সলিমপুরে গত বছরের অক্টোবর মাসে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়। পরের দিন, সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে দুইজন সাংবাদিক সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন। এই ঘটনা এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
র্যাবের ওপর হামলার আগে, র্যাব সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত অভিযানের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা দপ্তর থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে র্যাব ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি মামলার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আদালতে শুনানির তারিখ নির্ধারিত হবে, যেখানে র্যাবের সদস্যদের নিরাপত্তা, অভিযানের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, তদন্তের ফলাফল অনুসারে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবৈধ বসতি নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই ঘটনায় র্যাবের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, জঙ্গল সলিমপুরের অবৈধ বসতি ও সন্ত্রাসী উপস্থিতি নির্মূলের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা জোর দেন। ভবিষ্যতে এলাকার নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারী ও স্থানীয় সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।



