সুইস-ইতালিয়ান লেখক-নির্দেশিকা পেট্রা ভল্পের নতুন ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র ‘ফ্র্যাঙ্ক ও লুই’ ২৫ জানুয়ারি সান্ড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার লাইন‑আপে বিশ্বপ্রদর্শনী পায়। চলচ্চিত্রটি বয়স্ক বন্দীদের যত্নের চাহিদা ও পুনর্বাসনের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করে, যা সাধারণত উপেক্ষিত একটি বিষয়। ভল্পের লক্ষ্য হল কারাগারের কঠোর পরিবেশে মানবিকতা ও সহানুভূতির ভূমিকা তুলে ধরা।
পেট্রা ভল্পের পূর্বের কাজ ‘লেট শিফট’ স্বল্প সময়ে বক্স অফিস ও সমালোচনায় সাফল্য অর্জন করে, এবং সুইজারল্যান্ডের ওসকার জন্য দেশের প্রতিনিধিত্বকারী চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়। এই ছবিতে লিওনি বেনেশ (‘দ্য টিচারস লাউঞ্জ’) এক অতিরিক্ত কাজের চাপে থাকা নার্সের চরিত্রে অভিনয় করেন, যা ভল্পের সামাজিক বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। ‘ফ্র্যাঙ্ক ও লুই’ তার ইংরেজি‑ভাষার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, এবং এতে তিনি বয়স্ক বন্দীদের যত্নের সমস্যাকে কেন্দ্র করে নতুন দৃষ্টিকোণ নিয়ে আসছেন।
চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া মেনস কলনি, সান লুইস অবিস্পোর একটি ‘গোল্ড কোয়াটস’ নামের সহকর্মী সহায়তা প্রোগ্রাম থেকে এসেছে। এই উদ্যোগে বন্দীরা একে অপরকে স্নেহ ও সহায়তা প্রদান করে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক বলে ধরা হয়। ভল্প গবেষণার সময় সরাসরি বন্দীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দেখেন যে যত্নের কাজ কেবল গ্রহণকারী নয়, প্রদানকারীকে ও আত্ম-যত্নের অনুভূতি দেয়।
‘ফ্র্যাঙ্ক ও লুই’ সান্ড্যান্সের প্রিমিয়ার লাইন‑আপে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক ও দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উৎসবের এই বিভাগটি নতুন ও উদ্ভাবনী চলচ্চিত্রকে সমর্থন করে, এবং ভল্পের কাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করবে। চলচ্চিত্রটি ইংরেজিতে তৈরি হলেও তার মূল থিম—যত্নের প্রয়োজনীয়তা ও মানবিকতা—সর্বজনীন।
ভল্পের মতে, যত্নের বিষয়টি সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অন্যের যত্নের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু বয়স্ক ও অসুস্থ অবস্থার কথা ভাবতে মানুষ অনিচ্ছুক থাকে, বিশেষ করে কারাগারের পরিবেশে। এই ট্যাবু ভাঙতে এবং মানুষের মৌলিক মানবিক চাহিদা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণার সময় ভল্প বেশ কয়েকজন বন্দীর সঙ্গে আলাপ করেন, যারা ‘গোল্ড কোয়াটস’ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। তারা জানান যে যত্নের কাজ তাদেরকে আবার মানবিক অনুভব করায়, এবং এই অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এই পর্যবেক্ষণই ভল্পের জন্য প্রকল্পের মূল দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে, যেখানে তিনি প্রশ্ন তোলেন—কোনো পরিবেশে, বিশেষ করে কারাগারের মতো নিষ্ক্রিয় স্থানে, কীভাবে মানবিকতা বজায় থাকে।
চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে বেন‑আদির অভিনয় করেন, যিনি প্রাথমিকভাবে যত্নের দায়িত্ব গ্রহণ করেন যাতে শীঘ্র মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। দীর্ঘ সময়ের কারাবাস তাকে শূন্যতা, শীতলতা ও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, যা আত্মরক্ষার একটি উপায়ও হতে পারে। লুইয়ের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে তার এই অবস্থা ধীরে ধীরে গলে যায়, এবং তিনি আবার জীবনের উষ্ণতা অনুভব করতে শুরু করেন।
বহু বন্দীর সাক্ষাৎকারে দেখা যায় যে যত্নের কাজ তাদেরকে আবার মানবিক করে তুলেছে, এবং এই অনুভূতি চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় বার্তা হয়ে দাঁড়ায়। ভল্পের দৃষ্টিতে, যত্নের মাধ্যমে মানুষ নিজেকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করে, এবং এটি কারাগারের কঠোর কাঠামোর মধ্যে এক ধরনের মুক্তি প্রদান করে।
‘ফ্র্যাঙ্ক ও লুই’ শুধুমাত্র একটি নাটকীয় গল্প নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য একটি আহ্বান। এটি দেখায় যে যত্নের কাজ কেবল শারীরিক সহায়তা নয়, বরং মানসিক পুনর্জীবনের একটি পথ। চলচ্চিত্রটি দর্শকদেরকে এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে এবং বাস্তব জীবনে সহানুভূতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করবে।
সান্ড্যান্সে এই চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী ভল্পের ক্যারিয়ারে একটি নতুন মাইলফলক, এবং বয়স্ক বন্দীদের সমস্যাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে এই ধরনের গল্পগুলো আরও বেশি স্বীকৃতি পাবে এবং সমাজে যত্নের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে বলে আশা করা যায়।



