দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলায় সরকারী নথিতে তালিকাভুক্ত শত শত উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন না হয়ে জাল সেতু ও ভুয়া স্কিমের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রকাশ পেয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে সড়ক, কালভার্ট, আয়রন ব্রিজ, গার্ডার সেতু ইত্যাদি নথিতে উল্লেখ আছে, তবে মাঠে পৌঁছে দেখা যায় নির্ধারিত স্থানে সেতুর বদলে বাঁশ ও সুপারিগাছের সাঁকো বসানো হয়েছে। পাঁচটি গ্রামবাসী ঝুঁকি নিয়ে এই অস্থায়ী সাঁকোর ওপর পারাপার করছেন।
সর্বোচ্চ ৯৬ মিটার দীর্ঘ গার্ডার সেতুর জন্য প্রায় দশ কোটি টাকার দরপত্র জারি করা হলেও, কাজের নামে কোনো প্রকৃত নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি; কেবল মাটি পরীক্ষা ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
প্রকল্পের অর্থের বেশিরভাগই একাধিক লাইসেন্স ব্যবহার করে একই পরিবারের নিয়ন্ত্রিত ঠিকাদারী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে। এই সংস্থাগুলোকে অধিকাংশ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, ফলে প্রকল্পগুলো জনসেবার বদলে পারিবারিক সম্পদ সঞ্চয়ের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিপর্যয়কালে পুনর্বাসন প্রকল্পেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতের নামে শতাধিক ভুয়া স্কিম তৈরি করে শত কোটি টাকা গায়েব হয়েছে। শহরের মাস্টারপ্ল্যান, গ্রামীণ অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগ সড়কসহ সব ধরনের প্রকল্পে এই ধরণের জালিয়াতি পুনরাবৃত্তি হয়েছে। প্রকল্পের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলেও বিল ভাউচার সম্পূর্ণভাবে তৈরি হয়েছে।
অ্যাকাউন্টিং বিভাগ ও লেজার রেকর্ডে দেখা যায়, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের বেশিরভাগই নির্দিষ্ট ঠিকাদারী সংস্থার মাধ্যমে টানা হয়েছে। এই সংস্থাগুলো একই পরিবারের সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত, যা স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ণ করেছে।
অবৈধ কার্যক্রমের পরিধি স্পষ্ট করতে, অ্যান্টি-করাপশন কমিশন (ACC) জেলায় তদারকি দল গঠন করে তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, নথিপত্রে উল্লেখিত প্রকল্পের বাস্তবায়ন না হওয়া সত্ত্বেও, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদনে অর্থের অদলবদল ও আত্মসাৎ হয়েছে।
ACC এর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের প্রায় ৭০% অংশই অনুপযুক্তভাবে ব্যবহার হয়েছে। তদন্তে জড়িত কর্মকর্তাদের মধ্যে জেলায় কাজ করা একাধিক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের পারিবারিক সংযোগের নাম উঠে এসেছে।
প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষের মতে, জালিয়াতির পরিমাণ ও প্রভাব বিবেচনা করে, মামলাটি আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে জেলা আদালতে শোনার কথা। আদালতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বিরোধী আইনের অধীনে অপরাধমূলক অভিযোগ দায়ের করা হবে এবং সম্পত্তি জব্দের প্রস্তাবও করা হয়েছে।
বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন, স্থানীয় জনগণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে দৈনন্দিন জীবনে যে অসুবিধা ভোগ করছে তা তুলে ধরছে। সেতু ও সড়কের অভাবে গ্রামগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বাধা, শিক্ষার্থী ও রোগীর চলাচলে ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই ঘটনা দেশের দীর্ঘমেয়াদী দুর্নীতি সমস্যার একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক শাসনের অভাব, শাসকের পরিবর্তন সত্ত্বেও ব্যবস্থার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকা, এবং জনসাধারণের সম্পদকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা এই অঞ্চলে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অধিক তদন্তে দেখা যাবে, একই রকম জালিয়াতি অন্য জেলায়ও ঘটছে কিনা এবং সংশ্লিষ্ট নীতি-নিয়মের দুর্বলতা কীভাবে দূর করা যায়। সরকারী পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ভবিষ্যতে প্রকল্পের অনুমোদন ও তহবিলের ব্যবহার পর্যবেক্ষণে স্বচ্ছতা বাড়াতে ডিজিটাল সিস্টেম প্রয়োগ করা হবে।
এই মামলার ফলাফল দেশের উন্নয়ন প্রকল্পে জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হলে, ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্নীতি রোধে সতর্কতা সৃষ্টি হবে।



