ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক ঘন্টার বেশি সময়ের বৈঠকের পর ইউরোপকে নিজেরাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বলে জোর দেন। তিনি ট্রাম্পকে পরিবর্তন না করার জন্য অনুরোধ করেন এবং ইউরোপের স্বনির্ভরতা না থাকলে সামরিক‑রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কঠিন হবে বলে সতর্ক করেন।
বৈঠকটি জেলেনস্কি অনুযায়ী ফলপ্রসূ ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল; তিনি ট্রাম্পের আতিথেয়তা ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দুজন নেতার আলোচনায় ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা, শাস্তি নীতি এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বৈঠকের পর জেলেনস্কি ডাভোসে আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনশীল হলেও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা এখনও অজানা বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমেরিকান নীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তবে পরিবর্তনের প্রকৃতি ও পরিধি সম্পর্কে স্পষ্টতা নেই।
এই দ্রুত পরিবর্তনের গতি ইউরোপের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জেলেনস্কি জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপকে এই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, নতুবা তা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়বে।
ইউরোপের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন, বিশেষ করে ইউক্রেনের বিষয়টি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ তুলে। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু দেশ ইউরোপীয় স্বার্থের পক্ষে নয়, যদিও তারা নিজেকে ইউরোপের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে উপস্থাপন করে।
অন্যদিকে, কিছু শক্তিশালী ইউরোপীয় নেতা প্রায়ই অন্য দেশের নির্দেশনা অনুসরণ করে, স্বতন্ত্র নীতি গড়ে তোলার বদলে বহিরাগত নির্দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকে। জেলেনস্কি প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের নেতৃত্ব কতদিন পর্যন্ত টিকে থাকবে এবং কখন তারা নিজস্ব শক্তি পুনরুদ্ধার করবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো বড় শক্তি এভাবে পরিচালিত হতে পারে না; ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। বর্তমান সময়ে ইউরোপীয় জীবনধারা ও মূল্যবোধের জন্য যে চ্যালেঞ্জগুলো উদ্ভূত হচ্ছে, সেগুলোকে অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়।
জেলেনস্কি উল্লেখ করেন, আজ (শুক্রবার) সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি মুখোমুখি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হল চলমান সংঘাতের সমাধানে নতুন দিকনির্দেশনা খোঁজা এবং সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিক, রাশিয়ার প্রতিনিধি এবং ইউক্রেনের দল একত্রিত হয়ে কূটনৈতিক চ্যানেল পুনরায় সক্রিয় করার প্রচেষ্টা করবে। জেলেনস্কি আশা প্রকাশ করেন, এই আলোচনায় ইউরোপের স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে।
ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখনো নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন পুনর্বিবেচনা করতে হবে, কারণ আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। জেলেনস্কি উল্লেখ করেন, ইউরোপের নিরাপত্তা নীতি যদি বাহ্যিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
এই বিবৃতি ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র বিতর্কের সূচনা করতে পারে। কিছু বিশ্লেষক ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা কাঠামোতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করছেন, অন্যদিকে কিছু দেশ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে।
জেলেনস্কির মন্তব্যের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি পুনর্নির্মাণের চাপ বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিশেষ করে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে নিজেদের রক্ষা করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অনিশ্চয়তা মোকাবেলায় স্বতন্ত্র পদক্ষেপ নিতে পারে।
সারসংক্ষেপে, জেলেনস্কি ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন না করার আহ্বান জানিয়ে ইউরোপকে স্বনির্ভর রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি ইউরোপীয় নেতাদেরকে আত্মবিশ্বাসী ও স্বতন্ত্র নীতি গড়ে তোলার জন্য অনুরোধ করেছেন, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যায়।
এই বিবৃতি ইউরোপীয় নিরাপত্তা নীতির পুনর্বিবেচনা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার নতুন দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



