চীনের শেনঝৌ-১৫ মহাকাশযান ২ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ভেঙে পড়ে। এই ভাঙ্গনের প্রক্রিয়া দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সিসমিক নেটওয়ার্কের সিসমোমিটারগুলো রেকর্ড করেছে। গবেষকরা এই ডেটা ব্যবহার করে বাকি অংশের গতি ও উচ্চতা নির্ণয় করেন।
সিসমিক স্টেশনগুলো শোনায় শক ওয়েভের কম্পন, যা বায়ুতে প্রবেশের সময় ধ্বনির গতির চেয়ে দ্রুত গতিতে চলা ধ্বংসাবশেষ থেকে উৎপন্ন হয়। মোট ১২৭টি সিসমোমিটার একই সময়ে সংকেত গ্রহণ করে, ফলে সিগনালের তীব্রতা ও পৌঁছানোর সময় সুনির্দিষ্টভাবে মাপা যায়।
সংগৃহীত কম্পনের তীব্রতা ও সময়ের পার্থক্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধ্বংসাবশেষের উচ্চতা ও পথে পরিবর্তন অনুমান করতে সক্ষম হন। একই সঙ্গে তারা দেখেছেন যে শেনঝৌ-১৫ একাধিক টুকরোতে ভেঙে প্রতিটি টুকরো নিজস্ব শক ওয়েভ তৈরি করেছে, যা পৃথকভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব হয়েছে।
মহাকাশে থাকা বর্জ্য সাধারণত গ্রাউন্ড রাডার দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়, যা প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার আকারের বস্তু পর্যন্ত সনাক্ত করতে পারে। তবে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর বায়ুর ঘর্ষণ ও তাপের প্রভাবে ধ্বংসাবশেষ দ্রুত ভেঙে যায়, ফলে তাদের গতিপথ পূর্বাভাসে বড় বিচ্যুতি দেখা যায়।
শেনঝৌ-১৫ এর ক্ষেত্রে, সিসমিক ডেটা দেখিয়েছে যে ধ্বংসাবশেষের প্রকৃত পথ যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস কমান্ডের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল। এই পার্থক্য শত শত কিলোমিটার বিচ্যুতি ঘটতে পারে এমন প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট।
এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে ভূকম্পন সনাক্তকারী নেটওয়ার্কগুলো কেবল ভূমিকম্পই নয়, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করা অপ্রয়োজনীয় মহাকাশযান বা লঞ্চ হার্ডওয়্যারও ট্র্যাক করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে মানুষ ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা রক্ষায় অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম যোগ হবে।
এধরনের পদ্ধতি প্রথমে গ্রহীয় শিলাবৃষ্টির (মেটিওরয়েড) ট্র্যাকিংয়ে ব্যবহৃত হয়, যেখানে সিসমিক ও শব্দগত ডেটা একত্রে বিশ্লেষণ করে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের মুহূর্ত নির্ধারণ করা হয়। একই নীতি চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে।
বিশেষ করে, নাসার ইনসাইট মিশনের সময় সিসমিক ডেটা ব্যবহার করে মেটিওরয়েডের উৎস ও শক্তি নির্ণয় করা হয়েছিল, যা এই গবেষণার পেছনের প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
সিসমিক নেটওয়ার্কের এই নতুন ব্যবহার ভবিষ্যতে বড় আকারের বর্জ্য পুনঃপ্রবেশের পূর্বাভাসকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে। তাছাড়া, রাডার সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা সহজ হবে।
বৈশ্বিকভাবে মহাকাশ বর্জ্য সমস্যার গুরুত্ব বাড়ার সাথে সাথে, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সিসমিক পর্যবেক্ষণকে একত্রিত করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে। এতে করে পুনঃপ্রবেশের সময় সঠিক সময়সূচি ও নিরাপদ অঞ্চল নির্ধারণ সম্ভব হবে।
এই গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞান জগতে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে সিসমিক ডেটা ব্যবহার করে আরও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন সিসমিক নেটওয়ার্কের এই নতুন ভূমিকা মহাকাশ বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে? মন্তব্যে জানান।



