ফরাসি নৌবাহিনী বৃহস্পতিবার সকালে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার আটক করেছে। ট্যাঙ্কারটির নাম ‘গ্রিনচ’, যা উত্তর রাশিয়ার মুরমানস্ক বন্দর থেকে রওনা হয়েছিল এবং স্পেনের দক্ষিণ উপকূল ও মরোক্কোর উত্তর উপকূলের মাঝামাঝি অঞ্চলে ধরা পড়ে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সমুদ্র সংক্রান্ত চুক্তি অনুসারে পরিচালিত বলে জানিয়েছেন।
অভিযানটি ফরাসি সমুদ্র উপকূলীয় পুলিশ এবং নৌবাহিনীর যৌথ কার্যক্রমের ফল, যেখানে যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর অংশগ্রহণের তথ্যও পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়। ট্যাঙ্কারটি ‘ভুয়া পতাকা’ ব্যবহার করে চলার সন্দেহ ছিল, যা আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নিয়ম লঙ্ঘনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
মাক্রোঁ প্রেসিডেন্টের মতে, রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ‘ছায়া নৌবহর’ নামে পরিচিত গোপনীয় তেল পরিবহন ব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রমকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, “আমরা আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখতে এবং নিষেধাজ্ঞার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
ফরাসি কর্তৃপক্ষের বিবৃতি অনুযায়ী, ট্যাঙ্কারটি আটকে যাওয়ার পর তা অন্য গন্তব্যে স্থানান্তর করা হয়েছে, তবে নতুন গন্তব্যের সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে, ট্যাঙ্কারটির কার্যক্রমের উপর একটি বিচারিক তদন্ত শুরু হয়েছে, যা রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের সম্ভাব্য প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই ধরণের ধরা-ফাঁদকে রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তারা উল্লেখ করেন, রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ভুয়া পতাকা, রেজিস্ট্রি পরিবর্তন এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ ব্যবহার করে তেল পরিবহন চালিয়ে যাচ্ছে, যা সমুদ্র নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক তেল বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমন্বিত নীতি অনুসারে, রাশিয়ার তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ২০২২ সালের শুরুর দিকে আরোপিত হয় এবং তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফরাসি নৌবাহিনীর এই পদক্ষেপটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচিত, যেখানে সদস্য দেশগুলো সমুদ্র পথে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারী জাহাজ শনাক্ত ও আটক করার জন্য সমন্বিত নজরদারি চালাচ্ছে।
যুক্তরাজ্যও একই সময়ে তার নৌবাহিনীর মাধ্যমে সমুদ্র পর্যবেক্ষণ বাড়িয়ে তুলেছে এবং ফরাসি নৌবাহিনীর সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি করে ট্যাঙ্কারটি ধরা সম্ভব হয়েছে। উভয় দেশের সমন্বিত প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন, বিশেষ করে ১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র সংক্রান্ত চুক্তি, মেনে চলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনার পর ফরাসি সরকার রাশিয়ার সমুদ্র পথে অবৈধ তেল পরিবহন বন্ধ করার জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। তদুপরি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ মোকাবিলায় নতুন সমন্বিত নীতি প্রণয়নের সম্ভাবনা আলোচনা করা হয়েছে।
ভূমধ্যসাগরের এই অংশটি ঐতিহাসিকভাবে বাণিজ্যিক রুটের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে ইউরোপ ও আফ্রিকার সংযোগস্থল গড়ে ওঠে। রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারী জাহাজের উপস্থিতি এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বচ্ছতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ফরাসি নৌবাহিনীর এই সফল অভিযান রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় অবস্থানকে পুনর্ব্যক্ত করে। ভবিষ্যতে, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় বাড়িয়ে রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।



