শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এখনও দেশের বিভিন্ন স্তরে চলমান, যদিও ২০১১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধের নীতি জারি করে এবং অপরাধবিধি অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকার জরিমানা নির্ধারিত হয়েছে।
শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা বলতে হেফাজতে থাকা শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, অরক্ষিত অবস্থায় পরিত্যাগ, ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার বা অশালীনভাবে প্রদর্শন করা এবং ফলে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হওয়া অন্তর্ভুক্ত। এই অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাবাস বা এক লাখ টাকার জরিমানা, অথবা উভয়ই হতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের নীতি সত্ত্বেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি; বিশেষ করে প্রাথমিক ও প্রি-স্কুল স্তরে তদারকি দুর্বল। নীতি প্রয়োগের ফলে পূর্বের তুলনায় শাস্তি কমে এসেছে, তবে মানসিক শাস্তি এখনও ব্যাপকভাবে দেখা যায়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার উল্লেখ করেন, সামাজিক অসহিষ্ণুতা বাড়ার ফলে শিশুর ওপর প্রভাব বাড়ছে। তিনি বলেন, এই সমস্যার মূল কারণ তদারকি ব্যবস্থার ঘাটতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের অভাব।
কিন্ডারগার্টেন ও প্রি-স্কুলগুলোতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলকভাবে কম, ফলে শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয়নি। তবে নীতি প্রয়োগের ফলে পূর্বের তুলনায় শাস্তির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বৈশ্বিক সংস্থা ‘দ্য গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ টু এন্ড অল কর্পোরাল প্যানিশমেন্ট অব চিলড্রেন’ ২০০১ সালে শিশুদের শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন শুরু করে এবং ২০২০ সালে ‘এন্ড কর্পোরাল প্যানিশমেন্ট’ নামে পুনর্গঠন করে। ২০২৪ সালের আপডেটেড রিপোর্টে বাংলাদেশে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধের নীতি আইনগত রূপে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বর্তমান আইনশৃঙ্খলে স্কুলের বাইরে বাড়ি, দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং অন্যান্য শিশুর যত্নস্থলে শারীরিক শাস্তি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। এই ফাঁকফোকরই প্রায়শই নির্যাতনের সুযোগ তৈরি করে।
ঢাকা শহরে ২০২৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের গবেষণায় দেখা যায়, পরিবারে ৫৮ শতাংশ শিশুর উপর নির্যাতন ঘটে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩২ শতাংশ এবং অন্যান্য পরিবেশে ১০ শতাংশ। গবেষণায় শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিক দমনও উল্লেখযোগ্য।
২০ জুন ২০২৩-এ এক শিশুর ঘুমের সময়ই মুখ সিলিয়ে না দেওয়ার দাবি করে চিৎকার শোনা যায়; এই ঘটনা স্থানীয় মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়। শিশুর পরিবার ও আশেপাশের লোকজনের মতে, শিশুটি শারীরিক শাস্তি সহ্য করতে পারছিল না এবং তা মানসিক ক্ষতি সৃষ্টি করেছে।
এই ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বর্তমানে মামলাটি আদালতে পাঠানো হয়েছে, যেখানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে।
আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও, শিশু অধিকার সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠী সরকারকে দ্রুত আইন প্রণয়ন ও তদারকি শক্তিশালী করার আহ্বান জানাচ্ছে। তারা জোর দিয়ে বলছে, শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধের নীতি বাস্তবায়ন না হলে শিশুর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে।
শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও, বাস্তবায়নের ঘাটতি ও তদারকি দুর্বলতা সমস্যার মূল। সুতরাং, আইনগত কাঠামোকে শক্তিশালী করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদারকি বাড়ানো এবং পরিবারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।



